ইন্দোনেশিয়ায় চিকিৎসা বঞ্চিত সুনামি আক্রান্তরা

0
38
views

ভয়াবহ সুনামিতে অন্তত ৪২৯ জনের প্রাণহানির পর ধ্বংসস্তূপে প্রাণের স্পন্দন খুঁজছে ইন্দোনেশিয়া। সুনামিতে আহত হয়ে কাতরাচ্ছে আরও অন্তত ১ হাজার ৪৫৯ জন। শিশুরা জ্বর ও মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হলেও তাদের জন্যও পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী নিশ্চিত করা যায়নি। তারা আশ্রয়কেন্দ্রে মেঝেতেই কাটাচ্ছেন দিন-রাত। এ অবস্থায় সেখানে স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। 

ইন্দোনেশিয়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ১৫০ জন। ড্রোন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে। সুনামিতে ঘরহারা ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন অস্থায়ী শিবিরে। সেইসব শিবিরে নেই পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও খাবার। আক্রান্তরা বাড়ি ফেরার সাহস পাচ্ছে না। এ অবস্থায় আবারও দুর্যোগের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র জানিয়েছেন, ক্রমাগত আনাক ক্রাকাতাও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে আবারও সুনামি আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, এ সময়ে লোকজনকে বীচ এবং উপকূলীয় এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

গত শনিবার (২২ ডিসেম্বর) সুন্দা স্ট্রেটে কারাকাতাউ (krakatau) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে সাগরের নিচে বিশাল এক ভূমিধস হয়। এর কারণে তৈরি হয় সুনামির ঢেউ। উদ্ধার তৎপরতায় ব্যবহৃত হচ্ছে ভারি যন্ত্রপাতি। মাটি খুঁড়ে বের করা হচ্ছে সুনামিতে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ। মঙ্গলবার উদ্ধারকারীরা ড্রোন ব্যবহার করে অভিযান চালাচ্ছেন। এখনও ক্রাকাতাউয়ের বাতাসে উড়ছে ধূসর ছাই।

জানা যায়, শনিবার উপকূলীয় শহর সুমাত্রা এবং জাভায় পর পর দুটি ঢেউ আঘাত হানে। প্রথম ঢেউ অতটা শক্তিশালী না হলেও দ্বিতীয় ঢেউটি ছিল ভয়াবহ। আনাক ক্রাকাতাও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সাগরতলে ভূমিধসের কারণেই এই সুনামির উৎপত্তি হয়েছে। এর সঙ্গে পূর্ণিমার প্রভাব যুক্ত হওয়ায় বিপুল শক্তি নিয়ে সৈকতে আছড়ে পড়েছে সুনামির ঢেউ।  রোববার আবারও আনাক ক্রাকাতাও আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত হয়। একটি চার্টার বিমান থেকে সুমাত্রা এবং জাভার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত সুন্দা স্ট্রেইট এলাকায় অগ্ন্যুৎপাতের ভিডিও ধারণ করা হয়। চারদিকে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে।

দেশটির আবহাওয়া সংস্থা জানায়, প্রায় ৬৪ হেক্টর এলাকা  সাগরে ভেসে গেছে।  ভারী বৃষ্টিপাত ও ঠিকভাবে দেখতে না পাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযানও ব্যহত হচ্ছে। সামরিক বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দল ড্রোন ব্যবহার করছে। অন্য একটি দল সঙ্গে নিয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকরকে। তারা উপকূলে সুনামির ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া একটি মঞ্চে খোঁজ করছেন প্রাণের। সুনামির আগে সেখানে পারফর্ম করছিলো রক ব্যান্ড সেভেন্টিন। প্রায় ২০০ অতিথি ছিলো সেখানে। জাতীয় উদ্ধার অভিযান সংস্থার মুখপাত্র ইউসুফ লতিফ বলেন, এমন কিছু জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যেগুলোর ব্যাপারে আমরা আগে চিন্তা করিনি। কিন্তু এখন আমরা অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় যাচ্ছি। সেখানে অনেক হতাহত রয়েছেন। 

ব্রিটিশ সংবাদমধ্যাম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ৮৮২ টি বাড়ি, ৭৩টি হোটেল ও ৪৩০টি নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০ বছর বয়সী নুরজানা বলেন, সুনামির সময় দরজা খুলে শুধু দৌড়াতে শুরু করেন তিনি। ওয়াল টপকে উঠতে থাকেন উপরের দিকে। চোখের সামনেই দেখতে পান কিভাবে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। নুরজানার মতো অনেক মানুষই এখন বাস্তুহারা।

শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ৪০ বছর বয়সী নেং সুমার্নি বলেন, ‘আমি তিনদিন ধেরে তিন সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে মেঝেতে ঘুমাচ্ছি। আমি ভয়ে আছি কারণ আমার বাসা উপকূলের কাছে।’ জেলা প্রশাসক আতমাদজা সুহারা বলেন, তিনি চার হাজার শরণার্থীকে সাহায্য করছেন। তিনি বলেন, ‘এখনও সবাই আতঙ্কিত।  আমরা প্রায়ই এমন দুর্যোগে পড়ি। কিন্তু এতটা ভয়াবহ পরস্থিতি কখনও হয়নি।

বেসরকারী সংস্থার হয়ে কাজ করা  চিকিৎসক রিজাল আলিমিন জানান,  ‘জ্বর আর মাথা ব্যাথার কবলে পড়েছে অনেক শিশু। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় যথেষ্ট পরিমাণ বিশুদ্ধ পানিও সরবরাহ করা যাচ্ছে না’। তিনি আরও বলেন, ‘প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের কাছে থাকা ওষুধের পরিমাণ নগন্য। উদ্ধার হওয়া মানুষদের জন্য এখানকার পরিস্থিতি মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি নেই। তাদের খাবার নেই। মেঝেতে ঘুমোতে হচ্ছে মানুষকে।’ 

ইন্দোনেশিয়া ভূমিকম্পপ্রবণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত। অঞ্চলটিকে ভূ-তাত্ত্বিকভাবে ‘রিং অব ফায়ার’ নামে পরিচিত। এজন্য প্রায়ই সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায়। গত সেপ্টেম্বরে উত্তরাঞ্চলীয় সুলাওয়েসি দ্বীপের পালু এলাকায় ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল।  এর পরপরই শুরু হয় সুনামি। সরকারি হিসেবে ওই দুই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর আশঙ্কা, প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা পাঁচ হাজার।

২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরে ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামিতে ১৩ দেশের ২ লাখ ২৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি নিহত হয়েছিলেন শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই। ১৮৮৩ সালে এবারের আগ্নেয়গিরিটিরই অগ্ন্যুৎপাতের কারণে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি সুনামি হয়েছিল, যাতে প্রাণ হারিয়েছিল ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ।