কাঁধের জয়েন্ট ছুটে যাওয়া ও করণীয়

কাঁধ তিনটি হাড় ও চারটি জোড়ার সমন্বয়ে তৈরি। চারটি জোড়ার মধ্যে একটি জোড়া (গ্লেনোহিউমেরাল জয়েন্ট) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গঠনগতভাবে খুবই অস্থিতিশীল হওয়া সত্ত্বেও মানবশরীরের অন্যান্য জোড়া থেকে কাঁধের জোড়ায় সব চেয়ে বেশি নড়াচড়া হয়। ফলে অতি সহজেই এই জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হয় বা ছুটে যায়। কোনো জোড়া একের অধিক ছুটে গেলে তাকে রিকারেন্ট (বারবার) ডিসপ্লেসমেন্ট বা রিকারেন্ট সাবল্যাক্সাশন বলে। লিখেছেন ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

কাঁধের-জয়েন্ট-ছুটে-যাওয়া-ও-করণীয়একবার জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হলে পরে জয়েন্ট ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৮৬.৬ শতাংশ এবং এটা প্রথম আঘাতের দুই বছরের মধ্যে শুরু হয়।
আঘাতের কারণে আঘাতের দিকে কাঁধের জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হয় ৬০ শতাংশ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হয় সামনের দিকে ৯৫ শতাংশ, পেছনের দিকে চার শতাংশ এবং নিচের দিকে এক শতাংশ ডিসপ্লেসমেন্ট হয়। জন্মগতভাবে জয়েন্টের লিগামেন্ট ও ক্যাপসুল ঢিলা থাকলে জয়েন্ট সব দিকে ডিসপ্লেসমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একে বহু দিক অস্থিতিশীল জোড়া বলে। ক্রিকেট, ভলিবল, বাস্কেটবল, জ্যাবলিন থ্রো খেলোয়াড়দের মাঝে কাঁধের জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্টের সম্ভাবনা বেশি। মৃগী রোগীর খিঁচুনির জন্য এবং ইলেকট্রিক শকের কারণে জোড়া ছুটে যায় পেছনের দিকে। স্ট্রোক এবং পেশি দুর্বলতা রোগের জন্য বেশি দুর্বল হলে জোড়া ছুটে যায়। এ ছাড়া প্রথম ছুটে যাওয়ার পর পরিচর্যা ভালোভাবে না হলে জোড়া বারবার ছুটে যায়। জোড় ডিসপ্লেসমেন্ট হলে কাঁধে ব্যথা হয়। তবে বারবার জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হলে কাঁধে কম ব্যথা অনুভব হয়। জোড়া ছুটে যাওয়ার পর বাহু একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকে এবং নাড়ানো যায় না। মাঝে মাঝে জোড়া কিছুটা ডিসপ্লেসমেন্টে হয় আবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে বসে যায়। এ ক্ষেত্রে শুধু ব্যথা অনুভব হয়। জয়েন্টে ডিসপ্লেসমেন্ট হলে জয়েন্টের জায়গায় ফাঁকা এবং ডিসপ্লেসমেন্টের জায়গায় ফুলা দেখা যাবে। কখনো কখনো ঘুমের মধ্যে, সাঁতরানোর সময় এবং খেলার সময় বাহুর একটা নির্দিষ্ট নড়াচড়ার জন্য কাঁধের জোড়া ছুটে যায়। উপরে কিছু ধরতে হাত বাড়ালে বা বাসের হ্যান্ডেল ধরে বাসে উঠতে চেষ্টা করলে জোড়া ছুটে যেতে পারে। জোড়া প্রথম ডিসপ্লেসমেন্ট হওয়া ৪০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে হিউমেরাল হেডে ফ্র্যাকচার বা হিল স্যাকস লেশন হয়। বারবার জোড়া ছুটে যাওয়ার জন্য গ্লেনয়েড রিম (বোনি ব্যাংকার্ট) ভেঙে যায় এবং জোড়ায় অসটিওআর্থ্রাইটিস হয় এবং জয়েন্ট নষ্ট হয়। জয়েন্টে পেইন হয় এবং জোড়া স্টিফ হয় বা জমে যায়। বয়স্কদের জোড়ার পেশি ছিঁড়ে যায় এবং হাত উপরে তুলতে পারে না। স্ক্যাপুলার অনিয়মিত মুভমেন্ট হয়, পেশি শুকিয়ে যায় এবং পিঠে ব্যথা হয়।
করণীয় :
কাঁধের জোড়া ডিসপ্লেসমেন্টের চিকিৎসার আগে এক্স-রে, আর্থোগ্রাফি, আলট্রাসনোগ্রাফি বা এমআরআইয়ের মাধ্যমে রোগের ডায়াগনোসিস করতে হবে। এক্স-রের বিভিন্ন ভিউ, রোগীর অসুবিধা এবং রোগীকে শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে অতি সহজেই এই রোগ ডায়াগনোসিস করা সম্ভব। বারবার জোড়া ছুটে যাওয়ার মেডিক্যাল বা কনজারভেটিভ চিকিৎসা খুবই সীমিত এবং সার্জিক্যাল চিকিৎসাই প্রধান। বাহুর যে মুভমেন্টে কাঁধের জোড়া ছুটে যায়, সেই ধরনের মুভমেন্ট না করা এবং পেশি শক্তিশালী হওয়া ব্যায়ামের সাহায্যে কিছু সময়ের জন্য সুস্থ থাকা যায়। বিভিন্ন পদ্ধতির অপারেশন করা যায়, তবে প্রতিটিরই সুবিধা ও অসুবিধা আছে। এর মধ্যে ‘ল্যাটারজেন্ট’ পদ্ধতিতে অপারেশন করা হলে জোড়ার স্থিতিশীলতা বেশি হয়। বর্তমানে জোড়ার চিকিৎসার এক সফল ও কার্যকর সমাধান এনেছে বিস্ময়কর আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারি। এটি হলো অর্থোপেডিক চিকিৎসায় বর্তমান যুগের সর্বশেষ ও সর্বাধুনিক পদ্ধতি। ছোট ছিদ্র্রের মাধ্যমে ক্যামেরাযুক্ত আর্থ্রােস্কোপ জয়েন্টে প্রবেশ করিয়ে এবং যন্ত্রের সাথে যুক্ত বাইরে মনিটর দেখে ল্যাবরাম, ক্যাপসুল ও লিগামেন্ট রিপেয়ার করা হয়। এই পদ্ধতিতে রোগী তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ও হয়ে ওঠে।