কাটা-ছেঁড়া ক্ষতের চিকিৎসা

0
6899
views

শুরুতেই আপনার হাত দুটি সাবান দিয়ে উত্তমরূপে ধৌত করে নিতে হবে।এরপর,গ্লোভস পরিধাণ করুন। গ্লোভস পরিধাণ আপনার সুরক্ষা এবং রোগীর চিকিৎসা প্রদানের জন্য খুবই গুরুত্ববহন করে।
তারপর,ক্ষত স্থান ও চারপাশ সাবান অথবা স্যাভলন এবং ফুটানো ঠান্ডা জল দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে নিন।যদি ক্ষত স্থান অনেক নোংরা থাকে তাহলে সাবান ব্যবহার করবেন নতুবা সাবান এড়িয়ে যাবেন।কারণ,সাবান মাংস পেশীর ক্ষতি করতে পারে। প্রাপ্যতা অনুযায়ী পভিসেপ/ভায়োডিন নামক আন্টিসেপটিক দ্রবণও ব্যবহার করতে পারেন।তবে,ক্ষতের উপর সরাসরি এলকোহল,টিংচার আয়োডিন বা মারথিয়োলেট ব্যবহার না করাই উত্তম কারণ,এগুলো মাংস পেশীর ক্ষতি করে ক্ষত স্থান পূরণে দেরি করায়।
ক্ষত পরিস্কার করার সময়  সর্তক দৃস্টি রাখতে হবে যাতে সব ময়লা দূর করা হয়।কোনো আলগা চামড়া থাকলে তা তুলে ক্ষতের নিচটা পরিস্কার করে দিতে হবে। ময়লার টুকরা বের করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন,তবে যন্ত্রপাতি গুলো ব্যবহারের পূর্বে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার অনেক পদ্ধতি থাকলেও গরম জলে ফুটিয়ে নেয়া সহজ এবং সুলভ। প্রয়োজনে সিরিঞ্জ বা ড্রপারে জীবাণুমুক্ত পানি,ডিস্টিল ওয়াটার অথবা নরমাল স্যালাইন ভরে ক্ষত স্থানে পিচকিরি দিয়ে পরিস্কার করেও  নিতে পারেন।ক্ষতের মধ্যে ময়লার টুকরা থেকে গেলে সংক্রমণ হতে পারে।এজন্য,পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা আছে এমন স্থান চিকিৎসা প্রদানের জন্য নির্বাচন করুন।ক্ষত পরিস্কার করে তার উপর জীবাণুমুক্ত পরিস্কার কাপড় বা গজ দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। তবে,লক্ষ্য রাখতে হবে গজ বা কাপড় যাতে পাতলা হয় এবং বাতাস চলাচল করতে পারে। কারণ,এটা ক্ষত দ্রুত সারাতে সহায়ক। অনেক সময় সামান্য ক্ষত বা কাটা-ছেঁড়ায় ব্যান্ডেজ না দিয়ে উত্তমরূপে পরিস্কার করে আন্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে বাতাসের সংস্পর্শে খোলা রাখলে দ্রুত শুকায়।এক্ষেত্রে,ক্ষত স্থান পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরী।
পরবর্তীতে,ক্ষতের অবস্থা অনুযায়ী নিয়মিত ড্রেসিং করাতে হবে এবং খেয়াল করতে হবে কোন সংক্রমণ হচ্ছে কিনা। মানুষ,কুকুর,বিড়াল,শুকর বা অন্য কোন পশুর কামড়ে ক্ষতের সৃস্টি হলে আক্রান্ত স্থান খোলা রাখতে হবে এবং নিয়মানুযায়ী ভ্যাকসিন নিতে হবে।
পুরনো,ময়লা বা যে সকল ক্ষতে সংক্রমণ হয়েছে সেগুলোও খোলা রাখা উচিত।
কাটা,ছেঁড়া বা অন্য যে কোন ভাবে ক্ষতের সৃস্টি হলে রোগীকে একটা টিটেনাস টক্সয়েড ইনজেকশন দিয়ে দিবেন,সে যদি আগে ধনুস্টাঙ্কারের টিকা না নিয়ে থাকে তাহলে পরবর্তী দুই মাস একটা করে টিটি ইনজেকশন দেয়ার জন্য ব্যবস্থাপত্রে উপদেশ দিয়ে দিবেন। ডায়াবেটিক রোগীর কাটা-ছেঁড়া ক্ষতের সৃস্টি হলে নিতে হবে বিশেষ পরিচর্যা এবং একই সাথে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে প্রয়োজন মাফিক ঔষধের মাধ্যমে।

কাটা-ছেঁড়া ক্ষতের পরিমান বেশি হলে কি করবেন?
কোন সদ্য কাটা স্থান যদি খুব পরিস্কার থাকে তাহলে তার প্রান্তদ্বয় বা ধারগুলো একসঙ্গে করে  জুড়ে দিলে ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে যায়।
কাটা-ছেঁড়া ক্ষত স্থান যদি নিচের শর্ত গুলো পূরণ করে তাহলে কোন মাঝারী ধরণের গভীর কাটা স্থান জুড়ে দিতে পারেন।সেক্ষেত্র, কাটা স্থানের ভিতরে যেন কোনো ময়লা লুকিয়ে না থাকে সেটা খেয়াল করতে হবে এবং ভালো ভাবে পরিস্কার করে নিতে হবে।
শর্ত সমূহঃ
১.কাটার দরুন ক্ষত স্থান যদি ১২ ঘন্টার কম পুরনো হয়।
২. যদি ক্ষত স্থান খুব পরিস্কার থাকে।

কাটা ক্ষত স্থান জুড়বার কয়েক ধরনের পদ্ধতি আছে।যেমনঃ
ক্ষতের আকার ও অবস্থান অনুযায়ী সেটা যদি কোন আঁঠালো টেপ দিয়ে জুড়ে দেওয়ার মত হয় এবং চামড়ার ধারগুলো বা প্রান্তদ্বয় যদি নিজ থেকে এক জায়গায় এসে যায় তাহলে,স্টিকিং প্লাস্টারের সাহায্যে বাটারফ্লাই ব্যান্ডেজ করে দেয়া যেতে পারে।

অনেক সময় সুতা দিয়ে ক্ষত স্থান সেলাই করার দরকার হয়, তখন সেলাইয়ের জন্য জীবাণুমুক্ত সার্জিক্যাল সুতা,সুচাল সুচ ব্যবহার করবেন।
প্রথম সেলাইটা কাটা স্থানের মাঝখানে করুন,তারপর বেঁধে জুড়ে দিন।সম্পূর্ণ কাটাটা জুড়তে আরো যতগুলো প্রয়োজন,সেলাই করুন।আটসাট বা টাইট করে সেলাই দিবেন না,শুধুমাত্র কাটা স্থানের প্রান্তদ্বয় বা ধার গুলো একসঙ্গে করে জুড়ে দিন।
সেলাই করার পর ক্ষত স্থান ব্যান্ডেজ করে ঢেকে দিতে হবে। সম্ভব হলে ব্যান্ডেজ করবার আগে ক্ষত স্থান জীবাণুমুক্ত গজের প্যাড দিয়ে ঢেকে দিতে পারেন। ব্যান্ডেজ ভিজে গেলে বা ময়লা ঢুকে গেলে ব্যান্ডেজ পরিবর্তন করতে হবে।
ভিজে নোংরা ব্যান্ডেজের থেকে কোন ব্যান্ডেজ না থাকা ভাল সেজন্য,ক্ষতের অবস্থা বুঝে নিয়মমতো ব্যান্ডেজ বদল করতে হবে। তবে ক্ষত স্থান জুড়ে,ব্যান্ডেজ করে দেওয়ার পর যদি সেখানে কোন ধরণের সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে সেলাইগুলো খুলে ক্ষতের জায়গা আন্টিসেপটিক দ্রবণ ও জীবাণু মুক্ত পানি দিয়ে ভাল ভাবে পরিস্কার করে খোলা রাখতে হবে এবং নিয়মিত ড্রেসিং করতে হবে।
ব্যান্ডেজ করার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবেন,হাত বা পা বেড় দিয়ে যে ব্যান্ডেজ বাঁধা হয় সেটা যেন এত শক্ত না হয় যাতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
শিশুদের ক্ষেত্রে হাতের বা পায়ের একটা বা দুইটা আঙ্গুলে ব্যান্ডেজ করার থেকে পুরো হাত বা পা ব্যান্ডেজ করে দেয়া ভাল।তাতে শিশু সহজেই ব্যান্ডেজ খুলে ফেলতে পারবে না।

কত দিন পর সেলাই কাটবেন এবং কিভাবে কাটবেন?
ক্ষতের ধরণ ও অবস্থানের উপর নির্ভর করে সেলাই কত দিন রাখতে হবে। সাধারণত ৬ থেকে ১২ দিনের (মুখে হলে ৬ দিন;শরীরে ৮ দিন;হাত ও পায়ে ১২ দিন) মধ্যে সেলাই কাটা হয়। সেলাই কাটার সময় গিঁটের একদিকে সুতাটা কেটে দিয়ে যতক্ষণ না সুতাটা বেরিয়ে আসে গিঁট ধরে টানুন।

-মেডিকেল অফিসার(এডি)
বাংলাদেশ ব্যাংক মেডিকেল সেন্টার
(সেন্ট্রাল ব্যাংক অফ বাংলাদেশ)