নিপা ভাইরাস – গঠন, রোগের লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

0
683
views

নিপা ভাইরাস

হেনিপা ভাইরাস (Henipavirus) প্যারামিক্সো ভাইরাসমূহের একটি গণ যা প্যারামিক্সোভিরিডি (Paramyxoviridae) গোত্রের মনোনেগাভিরালিস (Mononegavirales) বর্গের অন্তর্গত। এই গোত্রের ২টি সদস্যের নাম হচ্ছে- হেন্ড্রাভাইরাস এবং নিপাহ ভাইরাস।

নিপা ভাইরাসের গঠন .

 

হেনিপাভাইরাসের জিনোম (৩’ থেকে ৫’ মুখী সজ্জা) এবং পি জিন এর উৎপাদসমূহ

হেনিপা ভাইরাসগুলো প্লিওমরফিক(Pleomorphic) (বিভিন্ন আকার বিশিষ্ট), এবং ৪০-৬০০ ন্যানোমিটার ব্যাস বিশিষ্ট হয়ে থাকে।[৩] এদের ভাইরাল ম্যাট্রিক্স প্রোটিন এর উপরে একটি লিপিড পর্দা থাকে। ভাইরাসের কেন্দ্রে একটি এক-সুত্রক প্যাচানো আরএনএ জিনোম থাকে যা এন (নিউক্লিওক্যাপসিড) প্রোটিন এর সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে এবং এটি এল (বৃহৎ) প্রোটিন ও পি (ফসফোপ্রোটিন) এর সাথে সম্পৃক্ত যারা ভাইরাল রেপ্লিকেশন এর সময় আরএনএ পলিমারেজ এনজাইমের কাজ করে।
লিপিড পর্দার অভ্যন্তরে এফ (ফিউসন) প্রোটিন ট্রাইমার ও জি (সংযোগ) প্রোটিন টেট্রামার এর কাটা (Spike) থাকে। জি প্রোটিনের কাজ হচ্ছে ভাইরাসকে পোষক কোষের পৃষ্ঠে সংযুক্ত করা ইএফএনবি২(EFNB2) নামক একটি প্রোটিনের মাধ্যমে যা অনেক স্তন্যপায়ী প্রানীতে বিদ্যমান।[৪][৫] এফ প্রোটিন ভাইরাস পর্দা কে পোষক কোষপর্দার সাথে একত্রীভূত করে এবং ভিরিয়নের আধেয় (content) কে কোষের অভ্যন্তরে পাঠায়। এছাড়াও এই প্রোটিন আক্রান্ত কোষকে পার্শ্ববর্তী কোষগুলোর সাথে একত্রীভূত করে একাধিক নিউক্লিয়াস বিশিষ্ট বৃহৎ সিনসাইটিয়াতে (Syncytia) পরিনত করে।

নিপাহ ভাইরাস রোগের লক্ষণগুলো.

— এ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথমত জ্বরে আক্রান্ত হয়। মস্তিষ্কে ভয়াবহ প্রদাহ দেখা দেয়, সে মানসিকভাবে অস্থিরতায় ভোগে।
— মন-মেজাজ সব সময় উত্তেজিত থাকে। মাঝে মাঝে খিচুনিও দেখা দেয়।
— আবার এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর কোনো লক্ষণ প্রকাশ ছাড়া ভাইরাসটি ৪ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্তাবস্থায় থাকতে পারে।
— এনসেফালাইটিসের লক্ষণ দেখায়। লক্ষণগুলো অনেকটা ইনফ্লুয়েনজা জ্বরের মতো। যেমন—জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব, আলো সহ্য করতে না পারা ইত্যাদি।
এছাড়া অন্য উপসর্গগুলো হচ্ছে—
মাথা ঝিমঝিম করা, ঘুম ঘুম ভাব, জাগ্রত/সচেতন অবস্থার পরিবর্তনসহ অন্যান্য মানসিক সমস্যা।

নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়.

সরাসরি নিপাহ ভাইরাস নিরাময়ে কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন এখনও আবিষ্কার হয়নি। রোগের লক্ষণ বিবেচনা করে চিকিত্সকরা সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিয়ে থাকেন। তবে প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়—
১. বাদুড় থেকে প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে : পাখি দ্বারা আধা বা আংশিক ফল খাওয়া ও খেজুরের কাঁচা রস পান না করার জন্য ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
২. মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানো প্রতিরোধে : আক্রান্ত মানুষের সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। রোগীদের ব্যবস্থাপনায় ডাক্তারদের/স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
৩. ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যেন হাতের মাধ্যমে ভাইরাসটি না ছড়ায়।
৪. রোগী যে পাত্রে খাবার খায় সে পাত্রে খাবার না খাওয়ায় এবং রোগীকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩ ফুট দুরত্বে অবস্থান করা।
৫. রোগীর পরিচর্যা করার পর হাত ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
৬. নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ওই এলাকার মানুষকে আপাতত খেজুর গুড় ও রস, আখের রস, পেঁপে, পেয়ারা, বরইসহ স্থানীয় ফল বা অর্ধেক খাওয়া ফল না খাওয়া। ফলমুল খেলেও ভালভাবে ধুয়ে খেতে হবে।
৭. রোগীর কফ ও থুতু যেখানে সেখানে না ফেলে একটি পাত্রে রেখে পরে তা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৮. লক্ষনগুলো প্রকাশ পেলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

নিপাহ ভাইরাস রোগের চিকিৎসা.

 এখন পর্যন্ত এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। ঠিকমতো শুশ্রুষা হলেই রোগী বেঁচে যেতে পারে। আর এ জন্য আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। আক্রান্ত রোগীর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে জীবন রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই রোগের লক্ষণ দেখামাত্রই রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার সুবিধা জনসাধারণের সহজলভ্য করার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।