বাংলাদেশে এখন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৮ লাখ

0
109
views

বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে ক্যান্সার চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউট। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপতালসহ বিভাগীয় পর্যায়ের বড় বড় সরকারি হাসপাতালে আলাদা ক্যান্সার বিভাগ আছে। এছাড়াও জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ক্যান্সার ইউনিট থাকলেও এর কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র নয়। ১৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজে রেডিওথেরাপি বিভাগ থাকলেও রেডিওথেরাপি মেশিন আছে মাত্র ৯টিতে।

সম্প্রতি বেসরকারি পর্যায়ে কয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল ক্যান্সার চিকিৎসা নিয়ে এসেছে। ক্যান্সার চিকিৎসায় দিন দিন তারা উন্নতিও করছে। কিন্তু তা খুবই ব্যয়বহুল। এ অবস্থায় সমন্বিত ক্যান্সার চিকিৎসা এখন সময়ের দাবি।

জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের ক্যান্সার এপিডেমোলোজি বিভাগের প্রধান ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, বাংলাদেশে জনগোষ্ঠি ভিত্তিক আমাদের নিজস্ব কোন ক্যান্সার রেজিস্ট্রি (নিবন্ধন) চালু নাই। এটাকে আমাদের সংকট বলতে পারি। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত যে ক্যান্সার চিকিৎসা, এটাকে আমরা বলি সমন্বিত ক্যান্সার চিকিৎসা। যেখানে ক্যান্সারের ডায়াগনোসিসসহ ক্যান্সারের সবগুলো পদ্ধতি থাকবে। এরকম সেন্টার বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে এখনও একটিই আছে, সেটা হলো মহাখালী জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট হাসপাতাল। এর বাহিরে পুরাতন কয়টা মেডিকেল কলেজে ক্যান্সারের শুধু রেডিওথেরাপি বিভাগটা চালু আছে। কিন্তু সব জায়গায় আবার রেডিওথেরাপি মেশিন নেই। কয়েকটি মেডিকেলে এটা চালু করা হলেও, এখন আর সবগুলোতে চালু নেই।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক রোগীই তার ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন না। আবার কেউ আছেন টোটকা চিকিৎসা করান। আবার কেউবা জানতেই পারেন না যে, তিনি ক্যান্সারের রোগী। আমরা সর্বশেষ একটা জরিপ করেছিলাম ২০০৬ সালে, সে জরিপে দেখা যায়, ৪৫ হাজার রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। ওই বছরে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার।

ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার আইএআরসি’র সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৮ লাখ। ১ লাখ ৮ হাজার মানুষ প্রতিবছর ক্যান্সার মারা যায়। আর প্রতিবছর ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়।

ক্যান্সারের চিকিৎসা খরচ সম্পর্কে ডা. রাসকিন বলেন, বাংলাদেশে যারা সরকারি হাসপাতালে যারা সুযোগ পায়, তাদের চিকিৎসার খরচ তো বেশি না। রেডিওথেরাপি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ৩০/৩৫ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যায়। সরকারি হাসপাতালে সার্জারির ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির ওষুধ শুধু ঢাকায় আমাদের ইনস্টিটিউটেই সাপ্লাই আছে। তবে, এর মধ্যেও সব রোগীকে সব ওষুধ দেওয়ার মতো না। একজন রোগী যদি সরকারি হাসপাতালে সবটুকু চিকিৎসা নিতে পারে, তাহলে ১লাখ টাকার মধ্যে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপিসহ মূল চিকিৎসা খরচটা হয়ে যাবে। আর এই চিকিৎসাটা যদি প্রাইভেট হাসপাতালে করতে যায়, তাহলে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপিসহ সবমিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে যাবে। আবার এদের মধ্যে কিছু জটিল ক্যান্সার রোগী আছে, যাদের প্রতি ডোজ কেমোথেরাপিতেই দুই-আড়াই লাখ টাকা লাগে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বহুদিনের একটা দাবি ছিল, ৮টি বিভাগের জন্য আলাদা আঞ্চলিক বা বিভাগীয় হাসপাতাল তৈরি করার। সরকার এবার সেটা কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে একটা প্রকল্প প্রস্তাব স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয় থেকে অনুমোদিত হয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ে আছে। এই প্রস্তাবনার মধ্যে আছে, প্রতিটা বিভাগে মেডিকেল কলেজের পাশে আলাদা একটি ভবন হবে, সেখানে ক্যান্সারে ১০০ বেডের আলাদা একটা সেন্টার হবে। ৫০ বেড থাকবে ডে কেয়ার, কেমোথেরাপি, ব্লাড দেয়ার জন্য। অপারেশনের জন্য কমপ্লেক্স থাকবে। ডায়াগনোসিসের ব্যাবস্থা থাকবে।

ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার বলেন, সরকারি এ প্রকল্প প্রস্তাবের সাথে আমরা আরও কয়েকটি দাবি যুক্ত করছি। সেগুলো হলো, প্রিভেনশান, প্রতিরোধের জন্য এবং আর্লি ডিটেকশান স্ক্রিনিং পদ্ধতিগুলো থাকবে। এমনকি, প্রতিটি বিভাগীয় সেন্টারে একটা মোবাইল ক্যান্সার ডিটেকশান ইউনিট থাকবে, প্রতিটা জেলা উপজেলাতে রুটিন করে করে বাড়ি বাড়ি কাছাকাছি গিয়ে মানুষকে ক্যান্সার ও স্ক্রিনিং করবে।

উল্লেখ্য, এই প্রেক্ষাপটে জাপান বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ হচ্ছে ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরে এ বিষয়ে একটি যৌথ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় এখানে দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান আইচি হসপিটাল লিমিটেড এবং এথিক্স অ্যাডভান্সড টেকনোলোজি লিমিটেড (ইএটিএল) কর্তৃপক্ষ। এই ক্যান্সার হাসপাতালে জাপানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রোটন থেরাপি দিয়ে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা করা হবে, যা এখন পর্যন্ত ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরেরও কোন হাসপাতালে নেই।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রোটন থেরাপি জাপানে ক্যান্সার চিকিৎসায় বিরাট পরিবর্তন দেখিয়েছে, যা এই হাসপাতালের মাধ্যমে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। এ প্রযুক্তি কোন রকম পার্শপ্রতিক্রিয়া ছাড়া ক্যান্সার টিউমারের ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ধীরে ধীরে সব ধরনের ক্যান্সাসের জীবাণুকে ধ্বংস করতে কাজ শুরু করে প্রোটন থেরাপি।