বেসরকারি চিকিৎসকরা বোঝা

0
233

দেশে সরকারি সনদপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের কমপক্ষে ৭০ শতাংশই বেসরকারি খাতের, সরকারি চিকিৎসকদের তুলনায় যাঁদের কম আস্থায় নিচ্ছে মানুষ। মানের প্রশ্নেই মানুষের আস্থা পাচ্ছেন না এই বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক। এ ক্ষেত্রে নিম্নমানের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকদেরই মূলত দায়ী করা হয়। তা সত্ত্বেও বছর বছর বাড়ছে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা। তৈরি হচ্ছে নতুন হাজার হাজার চিকিৎসক, যাদের বেশির ভাগের ভরসা কেবল সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অখ্যাত কিংবা ছোট বা মাঝারি পর্যায়ের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক। অনেকে আবার কেবল প্রাইভেট চেম্বারেই সময় কাটান। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকদের মান এমন পর্যায়ে যে তাঁদের মধ্যে খুব কমসংখ্যকই সরকারি চাকরির জন্য যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছেন। সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেও যাঁরা সরকারি চাকরি লাভের সুযোগ পান না, তাঁদেরও শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।

দেশে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্স সম্পন্নকারী চিকিৎসকদের নিবন্ধন বা লাইসেন্স দিয়ে থাকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। ওই প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহিদুল হক বসুনিয়া কালের কণ্ঠকে জানান, সর্বশেষ হিসাব অনুসারে দেশে বিএমডিসির রেজিস্টার্ড চিকিৎসক সংখ্যা ৮৬ হাজার। তাঁদের মধ্যে মৃত্যুবরণকারী, দেশের বাইরে চলে যাওয়া এবং দেশেই অন্য পেশায় নিয়োজিত চিকিৎসক আছেন মোট ২০ হাজারের মতো। ৬৬ হাজার চিকিৎসকের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত আছেন ২৩ হাজার চিকিৎসক। বাকি প্রায় ৪৩ হাজার বা ৬৫ শতাংশ চিকিৎসকই দেশের বেসরকারি খাতে থেকে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত। বিএমডিসির রেজিস্ট্রার আরো জানান, পাঁচ বছর ধরে গড়ে প্রতিবছর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার করে নতুন চিকিৎসক নিবন্ধন নিচ্ছেন। শিগগিরই তা আরো বাড়বে।

স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ ও কোনো কোনো চিকিৎসক বলছেন, সাধারণত সরকারি চিকিৎসকদেরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে রোগীরা। এমনকি বেসরকারি হাসপাতাল বা চেম্বারে গিয়েও প্রাধান্য দেওয়া হয় সরকারি চিকিৎসকদের। কেবল বড় কিছু বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং বা নামের সুবাদে গুরুত্ব পান কিছুসংখ্যক বেসরকারি চিকিৎসক। এ ক্ষেত্রেও অবশ্য অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চিকিৎসকদের কদর বেশি। এতে সরকারি হাসপাতালের রোগীরা সরকারি চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। আর সরকারি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সময় দেওয়ার পুরনো অভিযোগ বারবারই নতুন করে ওঠে।

জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহাবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেসরকারি চিকিৎসকদের ভিড় যেভাবে বাড়ছে, তাতে তাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে তারা শিগগিরই সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ সরকারই তাদের নিবন্ধন দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএমডিসির মাধ্যমে। তাই তাদের খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। মানদণ্ডে যারা ভালো না, তাদের সরকার নিবন্ধন দিচ্ছে কেন? না দিলেই তো হয়! প্রয়োজনে নিবন্ধন দেওয়ার আগে আরো ভালো পদ্ধতিতে যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে। তা না করে সব বেসরকারি ডাক্তারকেই নিম্নমানের বলে তুচ্ছ ভাবা ঠিক নয়।’

ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত একজন বেসরকারি চিকিৎসক বলেন, ঢাকার বড় কয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল, সমিতিভুক্ত কয়েকটি বড় হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ছাড়া সব জায়গায়ই বেসরকারি চিকিৎসকদের অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু সামাজিক অবস্থানের কারণে তাঁরা তাঁদের কষ্টের কথা প্রকাশ করতে পারেন না। তিনি আরো বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কর্তৃপক্ষও সরকারি চিকিৎসকদের বেশি কদর করে। আমি তো সরকারি মেডিক্যাল থেকেই পাস করেছিলাম; কিন্তু বিসিএসে চান্স পাইনি বলে সরকারি চাকরি হয়নি—সেটা কি আমার অপরাধ! যারা বিসিএসে পাস করে না, তাদের সবাইকে কি খারাপ ছাত্র বলা যাবে?’

বিএমএর সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেসরকারি ডাক্তারদের মানোন্নয়নে আমরা কন্টিনিউ মেডিক্যাল এডুকেশন নামে একটি স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করেছি, যাতে তারা সর্বশেষ চিকিৎসা সম্পর্কে আপডেট হতে পারে। এ ছাড়া ভালো প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজগুলো থেকে এখন অনেক ভালো মানের ডাক্তার বের হচ্ছে। আর যেগুলো নিম্নমানের, যেগুলোতে শিক্ষক নেই, প্রয়োজনীয় হাসপাতাল নেই, পর্যাপ্ত রোগী, উপযুক্ত অবকাঠামো ও পরিবেশ নেই, সেখান থেকে তো ভালো ডাক্তার বের হওয়ার সুযোগ নেই। তাই আমরা এসব ক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তা করছি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। কারণ একেকটি পরিবার এখন লাখে লাখে টাকা খরচ করে সন্তানদের ডাক্তার বানালেও তাদের সঠিক শিক্ষা হচ্ছে কি না, সেটাও আমাদের দেখা দরকার।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যত দূর জানি, এখন বিসিএসে সরকারি মেডিক্যাল থেকে পাস করা ডাক্তারদের তুলনায় অনেক বেশিসংখ্যক আবেদনকারী থাকে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাসকৃত ডাক্তার। কারণ সরকারি মেডিক্যাল কলেজের তুলনায় বেসরকারি মেডিক্যালের আসন দ্বিগুণেরও বেশি। তবে শেষ পর্যন্ত কারা বেশি সরকারি চাকরি পাচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখা হয়নি।’

বেসরকারি চিকিৎসকদের মান সম্পর্কে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এটি সত্যি যে সব বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মান সমান নয়। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে নিম্নমানের। ফলে ওই শ্রেণির প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা ডাক্তারদের মেধাগত যোগ্যতার ঘাটতি থাকতেই পারে। আমরা চেষ্টা করছি এখন সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মানের দিকে বেশি নজর দেওয়ার। শুধু ডাক্তার বানালেই হবে না, তারা যেন দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন ডাক্তার হয়ে বের হতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

বেসরকারি চিকিৎসকরা শিগগিরই দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘দেশে ডাক্তারের সংকট কাটাতেই এর আগে একের পর এক প্রাইভেট মেডিক্যাল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগের তুলনায় সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু এখন আসলেই সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে ভাবনার। এ ক্ষেত্রে দূরদর্শী পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়েছে। কারণ অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের দেশে ডাক্তারের চাহিদা পূরণ হয়ে যাবে। তখন অতিরিক্ত ডাক্তাররা কী করবে? তাদের তো রপ্তানি করার পথও সংকুচিত হচ্ছে। সব দেশই এখন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডাক্তার তৈরির দিকে নজর দিয়েছে। অন্যদিকে এখনই তো আমরা তৈরি হওয়া ডাক্তারদের সরকারিভাবে কাজে লাগাতে পারছি না আর্থিক কারণে। তাদের কেবল চাকরি দিলেই তো হবে না, তাদের উপযুক্ত সম্মানী তো দিতে হবে। সেটার জোগান কোথা থেকে মিলবে?’

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বেসরকারি পর্যায়ের বেশির ভাগ চিকিৎসকের চাকরির নিশ্চয়তা নেই। মানুষও তাঁদের গুরুত্ব দেয় কম। বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে তাঁদের বেতন-ভাতাও অনেক কম। গ্রামপর্যায়ে এখনো মানুষ সরকারি চিকিৎসক না পেলে বিকল্প হিসেবে ডিপ্লোমাধারী উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার বা স্যাকমোর কাছে যায়। তবু এমবিবিএস ডিগ্রিধারী বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে যেতে চায় না। তাঁদের মান নিয়েও অনেকের মধ্যেই সন্দেহ ও দ্বিধা কাজ করে।

বিএমডিসির রেজিস্ট্রার অবশ্য বলেন, ‘মানের প্রশ্নে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকদের আলাদা করে বিচার করার সুযোগ নেই। একই যোগ্যতার মাপকাঠিতে আমরা সব ডাক্তারকে রেজিস্ট্রেশন দিয়ে থাকি। আর মানগত অবক্ষয়ের প্রশ্ন তুললে সরকারি ও বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই তোলা যায়। এ ছাড়া অনেক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা ডাক্তারও তো সরকারি চাকরি পাচ্ছে যোগ্যতার মাপকাঠিতেই। তাই সব প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার মান যে খারাপ সেটা বলার কোনোই সুযোগ নেই। অনেক প্রাইভেট মেডিক্যালেই ভালো শিক্ষা হচ্ছে।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার হাসপাতালে ডাক্তারদের মধ্যে চার ভাগের তিন ভাগই সরকারি মেডিক্যাল থেকে পাস করা, আর বাকি একাংশ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে আসা। তাদের মধ্যে আবার প্রায় ৯০ শতাংশই বিগত দিনে অ্যাডহকে নিয়োগ পাওয়া। বাকি কয়েকজন মাত্র আছে, যারা বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছে।’

সরকারের স্বাস্থ্য বুলেটিনের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিএমডিসির নিবন্ধনভুক্ত মোট চিকিৎসক (এমবিবিএস ও বিডিএস) সংখ্যা ৮৫ হাজার ৫৮৭। তাদের মধ্যে সরকারি চাকরিতে আছেন ২৫ হাজার ১০৭ জন চিকিৎসক।