মহাশ্বেতা দেবী আর নেই

0
306
views

‘হাজার চুরাশির মা’খ্যাত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী আর নেই। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা ১৬ মিনিটে দক্ষিণ কলকাতার মিন্টো পার্কের কাছে বেলভিউ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বোহেমিয়ান এই কথাসাহিত্যিকের বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

এই লেখককে মূত্র ও রক্তে সংক্রমণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় গত মে মাসে। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা ছাড়াও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন তিনি।

মহাশ্বেতার চিকিৎসা চলছিল বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. সমরজিৎ নস্করের অধীনে। তার চিকিৎসার জন্য ছয় সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ডও গড়া হয়। কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে অসম লড়াই লড়ে হার মানলেন কালজয়ী এই লেখক।
mahasweta-devi
আদিবাসী ও নারী অধিকারের জন্য আজীবন সংগ্রামী এই কথাসাহিত্যিকের মৃত্যুতে গভীর শোকের ছায়া নেমেছে কলকাতায়। তার প্রয়াণের খবর পেয়ে দিল্লি থেকে কলকাতায় এসে হাসপাতালে ছুটে যান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়।

এই লেখকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তিনি টুইটারে লিখেছেন, ‘ভারত এক মহান লেখিকাকে হারাল, বাংলা তার মাকে হারাল। আমি একজন ব্যক্তিগত পথপ্রদর্শককে হারালাম। মহাশ্বেতাদি শান্তিতে থাকুন।’

মমতা সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মহাশ্বেতা দেবীর প্রতি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ রবীন্দ্রসদনে রাখা হবে। পরে মরদেহ নিয়ে কলকাতায় মহা শোক মিছিল হবে। এরপর দুপুরে কেওড়াতলায় মহাশ্মশানে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে।’

‘কল্লোল যুগের’ অন্যতম খ্যাতিমান কবি ও সাহিত্যিক মনীশ ঘটকের মেয়ে মহাশ্বেতা দেবী ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের ঢাকায়। তার মা ধরিত্রী দেবীও সে যুগের পরিচিত লেখক ও সমাজকর্মী। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক ছিলেন তার কাকা।

মহাশ্বেতা দেবীর শিক্ষা জীবনের শুরু শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে তিনি স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষে করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।

এরপর মহাশ্বেতা দেবী ঘর বাঁধেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে। ১৯৪৮ সালে জন্ম হয় তাদের ছেলে নবারুনের। ১৯৫৯ সালে অবশ্য বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়।

১৯৬৪ সালে কলকাতার বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন মহাশ্বেতা দেবী; পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করেছেন। সেই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু।

তবে শুধুমাত্র সাহিত্যিক পরিচয়ের মধ্যেই আটকে থাকেননি মহাশ্বেতা দেবী। দলিত, আদিবাসী নারীদের অধিকারের দাবি নিয়ে সরব ছিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে থাকা লোধা ও শবরদের নিয়েও তিনি গবেষণা করেছেন। তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছেন জীবনভর।

মহাশ্বেতা দেবীর প্রয়াণে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতে নেমেছে শোকের ছায়া। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘অভিভাবককে হারালাম। একাকিত্ব অনুভব করছি। সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।’

পরিচালক ও অভিনেত্রী অপর্ণা সেন বলেছেন, ‘আমি শোকহাত। উনার কাজ ও বিশ্বাসে তফাত ছিল না।’

সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেন বলেছেন, ‘একটি যুগের অবসান।’ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।’

পরিচালক গৌতম ঘোষ বলেন, ‘সাংস্কৃতিক জগতের বিশাল ক্ষতি হলো।’ বলিউডের পরিচালক মহেশ ভাট বলেন, ‘নিপীড়িতদের লড়াইয়ের প্রতীক ছিলেন তিনি।’

নাট্যকার রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত বলেন, ‘কাজের মধ্যে বেঁচে থাকবেন উনি।’ অভিনেতা প্রসেনজিৎ বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের কালো দিন।’

শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের আদিবাসী নারীদের অধিকারের দাবিতেও লড়াই করেছেন এই সাহিত্যিক। মুণ্ডা বিদ্রোহের পটভূমি নিয়ে লেখা তার উপন্যাস ‘অরণ্যের অধিকার’ ১৯৭৯ সালে পায় সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার।

‘হাজার চুরাশির মা’ ছাড়াও মহাশ্বেতার লেখা শতাধিক উপন্যাসের মধ্যে ‘অগ্নিগর্ভা’, ‘ছোট্টি মুণ্ডা’. ‘ঝাঁসির রানি’, ‘তার তীর’, ‘বেনে বৌ’ এবং ‘রুদালি’সহ অনেকগুলোই এপার-ওপার দুই বাংলার পাঠকমহলেই জনপ্রিয়।

বেশ কিছু সিনেমাও হয়েছে এই কথাসাহিত্যিকের লেখা কাহিনী নিয়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সংঘর্ষ’ (১৯৬৮), ‘রুদালি’ (১৯৯৩), ‘হাজার চৌরাশি কি মা’ (১৯৯৮)।

তবে মহাশ্বেতা দেবীর জীবনের সেরা কীর্তি নিঃসন্দেহে ফিলিপাইনের র‌্যামন ম্যাগসাইসাই ও জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘হাজার চুরাশির মা’। বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক গোবিন্দ নিহালনি উপন্যাসটি অবলম্বন করেই তৈরি করেন ‘হাজার চৌরাশি কি মা’; যে ছবিটি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে, ফিল্মফেয়ারে জিতে নেয় বিশেষ জুরি পুরস্কার। এ ছবিতে অভিনয় করেছেন জয়া বচ্চন, দিব্যনাথের চরিত্রে অনুপম খের ও ব্রতীর চরিত্রে জয় সেনগুপ্তের মতো অভিনেতারা।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বর্তমান সময়ে ভারতের সবচেয়ে প্রবীণ সাহিত্যিকদের অন্যতম ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। জ্ঞানপীঠ, পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণ, বঙ্গবিভূষণসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০৭ সালে তাকে দেয়া হয় সার্ক সাহিত্য পুরস্কার। তবে সবচেয়ে বড় পুরস্কার বোধহয় প্রান্তিক মানুষ আদিবাসী, শবর, লোধা জনগোষ্ঠীর ‘মনের মানুষ হয়ে উঠা।