লিওনিদ রগোজভ এক সার্জন

0
88
views

১৯৬১ সালের শুরুর দিকের কথা। সেই সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি সামরিক ঘাটি তৈরীর জন্য ১২জনের একটি দলকে পাঠানো হয় বরফঘেষা পূর্ব এন্টার্কটিকার স্কিরমেচার ওয়েসিসে। লিওনিদ রগোজভ ছিলেন এই বারো সদস্যের দলের একমাত্র ডাক্তার। 

ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঘাটি তৈরির কাজ মোটামুটি শেষ হয়ে এলো। কিন্তু এন্টার্কটিকার সাথে সভ্য দুনিয়ার যোগাযোগের ব্যবস্থাতো তথৈবচ! প্রচন্ড তুষারপাতের কারণে বিমান যোগাযোগ বলতে গেলে অসম্ভব-ই। কাজেই একমাত্র ভরসা জলপথ। সেই সময়ে জলপথে রাশিয়া থেকে এন্টার্কটিকাতে পৌছুতে লাগতো ৩৬ দিন। কিন্তু বিধিবাম! জাহাজও আগামী একবছরের আগে তাদেরকে নেবার জন্য আসবে না।

সেই টিপটিপ প্রদীপের মতো জ্বলা ভরসাটাও যখন নেই, তখন চুপচাপ সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে চেয়ে ঢেউ গোণা ছাড়া আর কিইবা করার থাকে? এমন নিঃসঙ্গ সময়ে এপ্রিলের শেষের দিকে আরও খানিকটা চিন্তার কারণ হয়ে দাড়ালো রগোজভের পেটের ডানদিকের প্রচন্ড ব্যথা।

রগোজভ একজন অভিজ্ঞ সার্জন। তিনি খুব ভালোমতোই বুঝছিলেন এপেণ্ডিসাইটিসের কারণেই ব্যথা হচ্ছে। রাশিয়াতে তিনি রোগীদেরকে অসংখ্যবার এই সার্জারি করেছেন। এখনো তার কাছে সার্জারির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সব রয়েছে। কিন্তু রোগী যখন তিনি নিজেই, অপারেশন করবে কে?

একরাত্রে প্রচন্ড ব্যথায় তিনি ঘুমাতে পারলেন না। এপেণ্ডিক্স পারফোরেশনের কোন সুনিশ্চিত লক্ষণ তখনো না থাকলেও রগোজভ জানতেন, যে কোন সময়ই পারফোরেশন হয়ে যেতে পারে। তার সামনে মাত্র দুটো পথ ছিল।
এক. মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকা
দুই. নিজেই অপারেশনটা করার ঝুকি নেওয়া

জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে পড়া রগোজভের মন তাকে ঝুকিটাই নিতে বাধ্য করল। দলের দু’জন সঙ্গীকে প্রধান সহকারী হিসেবে নিয়ে রগোজভ অপারেশনের কাজ শুরু করলেন। লাইটের পজিশন ঠিক করলেন। এবং অপারেশনের সময়ে দেখতে যেন অসুবিধা না হয়, সেই কারণে আয়না ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেন। সহকারীদেরকে নির্দেশনা দিলেন, যদি কোন কারণে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান, তাহলে কিভাবে এড্রেনালিন ইন্জেকশন দিতে হবে, প্রয়োজন হলে কিভাবে আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেশন দিতে হবে, সব। তখন এন্টার্কটিকায় জেনারেল এনেস্থেসিওলজিস্ট পাওয়াতো আকাশ কুসুম ব্যাপার! নিজেই নিজেকে নোভোকেইন ইনজেকশন পুশ করলেন। এবডোমিনাল ওয়ালে ইনসিশন দিয়ে ভিতরে ঢোকার পর বাকীটুকু কাজ তাকে প্রচন্ড কষ্ট সহ্য করে করতে হয়েছে।

রগোজভ আয়না নিয়েছিলেন তার কাজের সুবিধার জন্য, কিন্তু আয়না বরং উল্টো করে দেখিয়ে তার সমস্যাই করছিল। তিনি আয়না ও গ্লাভস রেখেই টর্চ নিয়ে অপারেশন চালিয়ে গেলেন। কিন্তু সমস্যা পিছু ছাড়ল না তার।  রক্তপাততো চলছেই, এমন সময়ে অসতর্কতাবশত তিনি ব্লাইণ্ডগাটে ইনজুরি করে ফেললেন। সেটা সেলাই করে তিনি যখন এপেণ্ডিক্স পেলেন, তিনি দেখলেন, আর মাত্র একটা দিন পেরুলেই সেটি হয়তো পারফোরেটেড হয়ে যেত!

রগোজভ খেয়াল করলেন, তাঁর হৃৎপিন্ডের গতি কমে আসছে, তাঁর হাত ভারি ভারি লাগছে। ক্রমাগত তিনি দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলেন। চার-পাঁচ মিনিট সময় পরপরই তাকে ২০-২৫ সেকেন্ড করে বিশ্রাম নিতে হল। তার মনে হলো, তিনি সম্ভবত অপারেশনটি শেষ করতে পারবেন না।

তবু রগোজভ সাহস হারালেন না। টানা এক ঘন্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট শেষে তিনি যখন শেষ সেলাইটি দিলেন, তিনি তখন প্রচন্ডভাবে ক্লান্ত; কিন্তু একইসাথে আনন্দিতও বটে! তার সঙ্গীদের মুখেও হাসি। অনেকটা অনিশ্চিত সময় পেরিয়ে লিওনিদ রগোজভ তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন।

দুসপ্তাহ পরেই রগোজভ সুস্থ হয়ে উঠলেন। শেষমেষ বহু কাঠখড় পুড়িয়ে রগোজভ যখন দেশে ফেরেন, তিনি তখন জাতীয় ‘বীর’। তার অপারেশনের মাত্র আঠারো দিন আগে ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণে যান। এমনকি রগোজভকে কখনো কখনো ইউরি গ্যাগারিনের সাথেও তুলনা করা হতো! তুলনা করার জন্য চমৎকার কিছু ব্যাপারও উঠে এসেছিলো। তাদের দুজনের বয়সই সাতাশ ছিলো, তারা দুজনেই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন এবং দুজনেই এমন একটা কাজ করেছেন, যা তাদের আগে কেউ কোনদিন করেনি।

দুনিয়া কাপানো এই সার্জন পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ পুরষ্কার ‘অর্ডার অফ দ্য রেড ব্যানার অফ লেবার’ লাভ করেন। রগোজভ এটাই প্রমাণ করেছেন, সমস্ত পৃথিবী যদি একদিকে দাড়িয়ে যায়, অন্যদিকে দাঁড়ানো মানুষটার যদি বুকের ভেতর অফুরান সাহস থাকে, থাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যাবার অনিঃশেষ অহংকার, পৃথিবীও তার কাছে হার মেনে নেয়, নিতে বাধ্য।