শীতের রোগ

0
212
views

সর্দি-কাশি বা কমন কোল্ড, অ্যাজমা বা হাঁপানি, এডিনয়েড টনসিল বড় হওয়া ও প্রদাহ, বিভিন্ন ধরনের ডায়রিয়া এবং চামড়ার রোগ বিশেষত খোসপাঁচড়া এবং প্রদাহ এ সময়ে বেশি হচ্ছে। এ রোগগুলো প্রতিরোধের উপায় হল।

সর্দি-কাশি বা কমন কোল্ড

শীতে সবচেয়ে বেশি যে রোগ হয় তা হল সর্দি-কাশি, কমন কোল্ড বা ঠাণ্ডাজ্বর। সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস বিশেষত ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জার মাধ্যমে এ রোগের সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস, লালা, কাশি বা হাঁচি থেকে নিঃসরিত ভাইরাসের মাধ্যমে এই রোগের সংক্রমণ হয়। এর ফলে রোগীর জ্বর, গলাব্যথা, ঢোক গিলতে অসুবিধা, নাক বন্ধ, নাক দিয়ে অনবরত সর্দি নিঃসৃত হওয়া, খুসখুসে কাশি এবং এর ফলে গলা, মাথা এবং বুকে-পেটে ব্যথা অনুভূত হয়। কোনও কোনও সময় খাবারে অরুচি, পাতলা পায়খানা হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বিশ্রাম, প্রচুর পানীয়, ফলের রস, ফ্লুয়িড গ্রহণ করবেন। জ্বর, গলা ও শরীরে ব্যথা হলে বেদনানাশক প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খেতে পারেন। খুব বেশি জ্বর, গলাব্যথা, কাশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ব্যথানাশক ট্যাবলেট, এন্টিহিস্টামিন, কাশির সিরাপ এবং খুব অল্প মারাÍক রোগীর ক্ষেত্রে যথাযথ এন্টিবায়োটিক বিশেষত অ্যাজিথ্রোমাইসিন গ্রহণ করতে পারেন। সাধারণভাবে রাস্তায় চলাচলের সময় মাস্ক পরা, আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকা এবং তার ব্যবহƒত জিনিসপত্র ব্যবহার না করাই ভালো। তাজা ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

অ্যাজমা বা হাঁপানি

সাধারণত যে কোনও ঋতু পরিবর্তনের সময় বিশেষত শীতকালে অ্যাজমা বা হাঁপানির প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। যে কোনও বয়সের পুরুষ বা মহিলা এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। পরিবেশ দূষণ, শিল্পবর্জ্য থেকে উৎপন্ন ধুলাবালি,খাবার, ওষুধ অ্যাজমা বা হাঁপানির প্রকোপ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষত ফুসফুস এবং রেসপিরেটরি ট্র্যাক্টের প্রদাহ বা অ্যালার্জির কারণে হাঁপানি শীতকালীন একটি প্রধান অসুখ। হাঁপানি হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং তার তত্ত্বাবধানে নেবুলাইজার ব্যবহার করে যথাযথ এন্টিবায়োটিক এবং ব্রংকোডাইলেটার ওষুধ সেবন করে সুস্থ থাকতে হবে। তবে এর প্রকোপ যেন বেশি না হয় বা হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মাস্ক পরে চলাচল করতে হবে। যেসব খাবার, ওষুধ, ধুলাবালিতে পরিবেশগত এলার্জেন আছে সেগুলো থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। খুব মারাÍক হাঁপানি হলে যাকে স্ট্যাটাস অ্যাজমাটিক্যাস বলে, রোগীকে তখনই হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

এডিনয়েড বা টনসিলের প্রদাহ এবং বড় হওয়া

শীতে গলাব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ হল এডিনয়েড, টনসিল বড় হওয়া বা প্রদাহ হওয়া। এর ফলে রোগীর গলাব্যথা, ঢোক গিলতে কষ্ট, জ্বর, নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নেওয়া এবং ঘড়ঘড় শব্দ ইত্যাদি হতে পারে। এই রোগসমূহ অনেকের বারবার হয় এবং জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে তার উপদেশমতো ওষুধ গ্রহণ এবং কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেমনÑ গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলকুচি করা, এন্টিহিস্টামিন গ্রহণ এবং মারাÍক ক্ষেত্রে যথাযথ এন্টিবায়োটিক সহযোগে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে বড় এবং সফল চিকিৎসা হল নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ সার্জনের তত্ত্বাবধানে টনসিল বা এডিনয়েড কেটে ফেলা।

পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া

শীতকালে পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়ার প্রকোপ অন্য সময়ের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর অন্যতম প্রধান কারণ হল ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুঘটিত, ভাইরাসজনিত, ছত্রাক বা ফাংগাস জাতীয় প্রদাহ এবং আক্রমণ। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাÍক হল টাইফয়েড ও প্যারাটাইফয়েডজনিত ব্যাকটেরিয়াজনিত ডায়রিয়া, পেটের পীড়া। সাধারণত অস্বাস্থ্যকর নোংরা এবং যারা এই রোগের বাহক তাদের হাত, নখ, বর্জ্য ও পায়খানা থেকে এ ধরনের রোগ সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত রোগীদের পেটের পীড়া, ডায়রিয়া এবং খুব জ্বর হয়। সঠিক রোগ নির্ণয় করে এর যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়, না হলে পরবর্তী সময়ে সুদূরপ্রসারী জটিলতা তৈরি হতে পারে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নাড়িভুঁড়ি ফুটো হয়ে যাওয়া বা পারফরেশন হওয়া। ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া এমনিতেই সঠিক পরিমাণে ফ্লুয়িড গ্রহণ করলে ভালো হয়ে যায়। আবার কলেরার কারণে বেশি পাতলা পায়খানা হলে এবং শরীর থেকে বেশি ফ্লুয়িড নির্গত হলে তা শরীরের জন্য মারাÍক পরিণতি বয়ে আনতে পারে; কোনও কোনও ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে। এজন্য চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পানীয়, ফ্লুয়িড গ্রহণ কোনও কোনও ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক সহযোগে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণভাবে ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসচেতনতা, খাবার আগে বা পরে, টয়লেট করার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে খাবার না গ্রহণ এবং প্রচুর পরিমাণে পানীয় গ্রহণ প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে।

ত্বকের রোগ

শীতে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ফেটে যাওয়া, চুলকানি, অ্যালার্জি, একজিমা এবং প্রদাহ বা ডার্মাটাইটিস, ঘা বেশি হয়ে থাকে। এজন্য অন্য সময়ের তুলনায় শীতে চামড়া, নখ ও চুলের যতœ বেশি করে নিতে হবে। আর্দ্রতাকারী জেল, ভেসলিন, লোশন, ওলিভ অয়েল, পমেড ইত্যাদি পানি দিয়ে ত্বক ধোয়ার পরে লাগাতে হবে। চামড়ায় ঘা, ক্ষত, চুলকানি চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ ব্যবহার করে কমাতে হবে। এছাড়াও যেসব খাবার খেলে, ওষুধের কারণে, ধুলাবালি বা পরিবেশগত অ্যালার্জেনের কারণে চামড়ার রোগ বেশি হয় সেগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে।