হাত-পা অবশ হওয়া রোগ লক্ষনের নাম জিবিএস

0
26
views

এ রোগটি একটু অপরিচিত। কিন্তু আশপাশের অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত হন। জিবিএস (গুলিয়ান-বারি-সিনড্রোম) একটি জীবাণু সংক্রমণজনিত রোগ। ক্যামপাইলো ব্যাকটার জিকুনি নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের ফলে জিবিএস দেখা দেয় বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়।

লক্ষণ : সাধারণ দেখা যায়, কয়েক দিন থেকে পাতলা পায়খানা, সঙ্গে একটু জ্বর তারপর হাত-পায়ে অবশ ভাব এবং ক্রমান্বয়ে হাত ও পায়ের শক্তি কমে। এমনকি হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা থাকে না। এটি ক্রমান্বয়ে শরীরের পেরিফেরি বা দূরের অংশ থেকে ওপরের দিকে আসে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রেসপি-রেটরি মাংসপেশি প্যারালাইজড হয়ে শ্বাস নিতে না পেরে ৫ থেকে ৬ শতাংশ রোগী প্রাণ হারায়।

এই রােগের কারন :
যদিও এই রােগ আক্রান্ত হওয়ার সঠিক কােন কারন এখন পর্যন্ত জানা যায়নি তবুও নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে এই রােগের উৎস হিসেবে ভাবা হয়:
১. কিছু ভাইরাল ইনফেকশন থেকে এই রােগ হতে পারে, যেমন- এইডস, হারপেস সিমপ্লেক্স, ম্যাগনিওক্লিওসিস ইত্যদি।
২. ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন থেকে এই রােগ হতে পারে।
৩. অনেক সময় সার্জারীর পরও এই রােগ হতে পারে।
এই রােগের চিহ্নসমুহ:
খুব দ্রূত খারাপ অবস্থার দিকে যেতে পারে এই রােগ। কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিনের মাঝে রােগীর হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। দুর্বলতা সাধারনত পা থেকে শুরু হয় এবং দুইপা সমানভাবেই আক্রান্ত হয়। আস্তে আস্তে পুরো পা থেকে কােমর পর্যন্ত অবশ হয়ে যায় এবং হাতও আক্রান্ত হওয়া শুরু করে। যেসব চিহ্নসমুহ দেখে জি.বি.এস. রােগ চেনা যায় সেগুলোর কয়েকটি নিম্নে দেয়া হল:
১. দুই পা এমনকি অনেকসময় দুই হাত ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যাওয়া।
২. হাত ও পায়ের বােধশক্তি কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক হয়ে যাওয়া।
৩. মাংশপেশীতে ব্যাথা হওয়া।
৪. শরীরে স্বাভাবিক রিফ্লেক্স প্রক্রিয়া কমে যাওয়া।
যেসব অবস্থা দেখে বুঝবেন রােগটি মারাত্বক আকার ধারন করেছে:
১. শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়া।
২. দীর্ঘশ্বাস না নিতে পারা।
৩. হঠাৎ নিশ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া কিছুক্ষনের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া।
৪. খাবার চিবাতে ও গিলতে সমস্যা হওয়া।
৫. মুখ দিয়ে লালা পড়া।
জি.বি.এস. রোগ নির্নয়ের উপায়:
একজন ফিজিওথেরাপিস্ট রােগীর রােগ বর্ণনা শুনে ও বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে জি.বি.এস রােগ নির্নয় করে থাকেন। সাধারনত এই রোগের জন্য যেসব প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করানো হয় সেগুলো হল:
১. সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড টেস্ট
২. ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম
৩. ইলেকট্রোমায়োগ্রাফী
৪. নার্ভ কন্ডাকশন ভেলোসিটি টেস্ট
৫. পালমোনারী ফাংশন টেস্ট
৬. রিফ্লেক্স টেস্ট
রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি:
জি.বি.এস. এর চিকিৎসায় মাল্টিডিসিপ্লিনারী টিম একসাথে কাজ করতে হয়। এই টিমে থাকেন:
১. নিউরোলজিস্ট
২. জেনারেল ফিজিশিয়ান
৩. ফিজিওথেরাপিস্ট
৪. অকুপেশনাল থেরাপিস্ট
৫. রোগীর অভিভাবক
প্রাথমিকভাবে রােগ নির্নয়ের পর রােগীর স্নায়ুর প্রদাহ বন্ধ করার জন্য এবং পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন ও ভাইরাল ইনফেকশন বন্ধ করার জন্য ঔষধ প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু রােগীর মাংশপেশীর শক্তি বৃদ্ধি করে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য ঔষধ প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন দ্রূত ফিজিওথেরাপী চিকিৎসা। সময়মত সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় এই রােগ সম্পূর্নরুপে নির্মূল করা যায়।
জি.বি.এস. এর চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপির ভূমিকা:
একজন নিওরোলজিকাল ফিজিওথেরাপিস্ট এসেসমেন্ট এর মাধ্যমে রােগীর রােগ নির্নয় করেন এবং তার শারীরিক সমস্যা খুঁজে বের করেন। এসব সমস্যা চিহ্নিতকরণসহ রোগীর পুনর্বাসন পরিকল্পনা করে থাকেন ফিজিওথেরাপিস্ট ।
একজন নিওরোলজিকাল ফিজিওথেরাপিস্ট যেসব সমস্যা নিয়ে কাজ করে থাকেন সেগুলো হল:
১. ব্যাথা কমাতে সাহায্য করা।
২. মাংশপেশীর শক্তি বৃদ্ধি করা।
৩. বিভিন্ন জয়েন্টের স্বাভাবিক নড়ানোর ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।
৪. বসা, দাঁড়ানো এবং হাঁটার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করা।
৫. বসা বা দাড়াানো অবস্থার ব্যালেন্স বাড়াতে সাহায্য করা।
৬. রোগীকে সঠিকভাবে হাঁটা শেখানো।
৭. রোগীর কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করা।
৮. হাঁটার জন্য সহায়ক উপকরন প্রেসক্রাইব করা
৯. রোগী ও রােগীর আত্বীয়স্বজনদের জি.বি.এস. এর পরবর্তী জটিলতা সম্পর্কে জানানো এবং এসব সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় জানানো।

জি.বি.এস. আক্রান্ত রােগীর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিজিওথেরাপী চিকিৎসা শুরু করা উচিত। হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায়ই এই চিকিৎসা শুরু করতে হয়। একমাত্র সঠিক ফিজিওথেরাপী চিকিৎসার মাধ্যমেই একজন জি.বি.এস. রােগীকে সঠিক পুনর্বাসন করে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব।

কাদের বেশি হয় : নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে, লিঙ্গভেদে  প্রকোপের তেমন পার্থক্য হয় না।

করণীয় : একিউট বা জরুরি অবস্থায় রোগীর অবস্থা যখন সংকটাপন্ন অর্থাৎ রোগী হাত-পা নাড়তে পারে না, এমনকি শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে—তখন রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের

ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ে।

পুনর্বাসন চিকিৎসা : এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সেরে উঠতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থার উন্নতির পর রোগীকে হাত-পায়ের শক্তি বাড়ানো ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ওষুধের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ভূমিকা পালন করে।