এসিড ও ক্ষতিকর উপাদান আমরা প্রত্যেক দিন খাছি

309

পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে সয়াবিন তেলের ৯টি ব্র্যান্ডের মধ্যে পাঁচটিতে, সরিষার তেলের ১২টি ব্র্যান্ডের মধ্যে ছয়টিতে, নারকেল তেলের ৯টি ব্র্যান্ডের মধ্যে চারটিতে ও একটি ব্র্যান্ডের সানফ্লাওয়ার তেল পরীক্ষা করে সেটিতে মাত্রাতিরিক্ত ‘এসিডিটি’ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্রাতিরিক্ত এসিডিটিযুক্ত তেল খেলে পেটে ‘এসিডিটি’ বেড়ে যায়। একসময় পাকস্থলীতে আলসার বা ঘা তৈরি হয়। ওই ঘা ক্যান্সারেও রূপ নিতে পারে।

ভোজ্য তেলের এসব পরীক্ষা করা হয়েছে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি’তে। নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কারিগরি সহায়তায় ওই পরীক্ষাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেটিকে দেশের জাতীয় ‘রেফারেন্স ল্যাবরেটরি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই পরীক্ষাগারে ‘হাই পারফরমেন্স লিকুইড ক্রোমটোগ্রাফি (এইচপিএলসি), গ্যাস ক্রোমটোগ্রাফি, এলসি-এমএসএমএসসহ অন্যান্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে। তেলের এ ধরনের পরীক্ষা বাংলাদেশের অন্য কোনো পরীক্ষাগারে করার মতো যন্ত্রপাতি নেই এবং এ পরীক্ষা এবারই প্রথম হয়েছে।

ওই পরীক্ষাগারে গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, নারকেল তেল ও ঘি পরীক্ষা করা হয়। ওই পরীক্ষাগুলোর ফলাফল লিখিত আবেদন করে সংগ্রহ করেছে কালের কণ্ঠ। তবে কোন কোন ব্র্যান্ডের তেল পরীক্ষা করা হয়েছে, তার নাম প্রকাশ করেনি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। তবে বাজারে থাকা ব্র্যান্ডের সংখ্যা ও তাদের পরীক্ষিত নমুনার সংখ্যা বলছে, বাজারের প্রায় সব ব্র্যান্ডের তেলই তাদের পরীক্ষার আওতায় এসেছে।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেলের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ১১টি প্রতিষ্ঠান ভোজ্য তেল আমদানি ও বাজারজাতে নিয়োজিত। এর মধ্যে কয়েকটি কম্পানি বন্ধ আছে। দু-একটির আবার একাধিক ব্র্যান্ড রয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে ৯ থেকে ১০টির বেশি ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল নেই। ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে ৯টি ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিন তেল ও একটি খোলা তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্র্যান্ডের বোতলজাত তেল ও খোলা তেলের নমুনাটিতে সহনীয় মাত্রার (২%) চেয়ে বেশি এসিডিটি পাওয়া গেছে।

বাজারে সরিষার তেলের ব্র্যান্ডের সংখ্যা ১২-১৩টির বেশি নয়। ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে ১২টি বোতলজাত সরিষার তেলের নমুনা ও তিনটি খোলা সরিষার তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্র্যান্ডের সরিষার তেলে ও তিনটি খোলা তেলের নমুনাতেই সহনীয় মাত্রার (১.২৫%) চেয়ে বেশি এসিডিটি পাওয়া গেছে।

বাজারে বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের সানফ্লাওয়ার তেল পাওয়া যায়। তবে ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরীক্ষার আওতায় এসেছে কেবল একটি ব্র্যান্ডের সানফ্লাওয়ার তেল। সেটিতেই মাত্রার (২%) চেয়ে বেশি এসিডিটি ধরা পড়েছে।

নারকেল তেল রান্নার কাজে ব্যবহার হয় না। তবে চুল ও ত্বকের যত্নে এটির ব্যবহার বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত। বাজারে থাকা ৯টি বোতলজাত ও একটি খোলা নারকেল তেলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, চারটি ব্র্যান্ডের তেলে মাত্রার (২%) চেয়ে বেশি এসিডিটি। তবে খোলা তেলটিতে এসিডিটির মাত্রা সঠিক পাওয়া গেছে।

যে কারণে বেড়ে যায় এসিডিটির মাত্রা : রসায়নবিদরা বলছেন, নানা কারণে তেলে থাকা ফ্যাটি এসিডের ‘কম্পোজিশন’ পরিবর্তন হলে এসিডিটির মাত্রা বেড়ে যায়। বাংলাদেশের ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে এর বেশ কিছু কারণের প্রধান কারণ হলো এক তেলে অন্য তেল ও রাসায়নিকের মিশ্রণ। সয়াবিন তেলে পাম তেল মেশানো, সরিষার তেলের ঝাঁজ বাড়াতে নানা রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ অনেক পুরনো। আবার সয়াবিন তেলকে বিভিন্ন রাসায়নিক মিলিয়ে সরিষার তেলে রূপান্তর করার কৌশলও ভেজালকারীদের জানা। এসব মিশ্রণের ফলে তেলের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয়ে সেটির এসিডিটি বেড়ে যাচ্ছে।

তেলের ‘ফ্যাটি এসিড প্রোফাইলিং’ করে নির্দিষ্ট তেলে কার্বনের পরিমাণ জানা যায়। একটি নির্দিষ্ট মাত্রার কার্বন তেলের স্বকীয়তা প্রমাণ করে। কার্বনের পরিমাণ দেখে তেলের ভেজাল বা মিশ্রণ ধরা যায়। ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় মিশ্রণের বিষয়টি ধরা পড়েছে। উল্লেখ্য, বাজারে পাম তেলের দাম সবচেয়ে কম। ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে একটি ব্র্যান্ডের পাম তেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে সেটিতে মাত্রাতিরিক্ত এসিডিটি নেই।

রসায়নবিদরা আরো জানান, তেল যে পাত্রে বাজারজাত করা হচ্ছে তা স্বাস্থ্যসম্মত ও খাওয়ার পণ্য পরিবহন করার উপযোগী (ফুড গ্রেড) না হলেও এসিডিটি বেড়ে যায়। এ ছাড়া তেল পুরনো হলে সেটির গুণগত মান নষ্ট হয়ে এসিডিটির মাত্রার পরিবর্তন হয়।

পেটে এসিডিটি তৈরি করে, হতে পারে ক্যান্সারও : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হুসেইন উদ্দিন শেখর কালের কণ্ঠকে বলেন, ভোজ্য তেলে মাত্রার চেয়ে বেশি এসিডিটি থাকলে তা মানুষের পাকস্থলী ও খাদ্যনালিতে প্রথমে এসিডিটি তৈরি করে, পরবর্তী সময়ে তা আলসার বা ঘা তৈরি করে। আলসার একসময় ক্যান্সারেও রূপ নিতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রার এসিডিটির তেল লিভার নষ্টের কারণও হতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তবে এসব কিছুই নির্ভর করে একজন মানুষ কত দিন ধরে ভেজাল তেল খাচ্ছে তার ওপর।

তিনি বলেন, ‘পেটের পীড়া এখন বাংলাদেশের জাতীয় রোগের মতো। এ রোগ নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এর বড় কারণ হতে পারে তেলের ভেজাল। তেল খায় না এমন মানুষ নেই। তেল ছাড়া রান্না করলে খাবার সুস্বাদুও হয় না।’

বেশি মাত্রার এসিডিটির নারকেল তেল ব্যবহার করলে চুল পড়া বন্ধের বদলে তা আরো বেড়ে যেতে পারে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বেশি মাত্রার এসিডিটি যুক্ত তেল মাথার ত্বক পুড়িয়ে কালো করে দেয়। এতে চুল পড়া বেড়ে যায়।’

নিয়মিত পরীক্ষা করে ব্র্যান্ডের নাম প্রকাশের দাবি ভোক্তা অধিকার কর্মীদের : এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ভলান্টারি কনজ্যুমার ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার আছে। সরকারের উচিত সেখানে নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষা করে জনগণকে জানানো ও কম্পানিগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদনে বাধ্য করা।’

তিনি যেসব ব্র্যান্ডের তেলে মাত্রাতিরিক্ত এসিডিটি পাওয়া যায়নি সেগুলোর নাম প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ক্রেতাদের অধিকার আছে ভালো জিনিস পছন্দ করে কেনার। এ ক্ষেত্রে কোন তেলটি ভালো তা প্রকাশিত হলে জনগণ তা কিনতে পারত। শুধু তেল নয়, সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে প্রধান প্রধান নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরীক্ষা করে ফলাফল জনগণকে জানানো। পরবর্তী সময়ে সব খাদ্য পরীক্ষা করা। শুধু একবার নয়, নিয়মিতভাবে করা।’ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. নীলুফার নাহার বলেন, ‘কোনো কোনো তেল আছে অনেক ভালো, কোনো কোনো তেল তেমন ভালো নয়। কিছু তেল দেখা যায়, যেটা ভুল উপাদানের মিশ্রণ বেশি। যে চর্বি থেকে সাবান বানানো হয়, সেগুলো খাবার তেলে মেশানো হচ্ছে।’