ডা. সাঈদা সুলতানা ও ডলির কিছু কথা — ভালো থাকুন

ডা. সাঈদা সুলতানা ও ডলির কিছু কথা

নিঃসন্তান দম্পতির চেয়ে অভাগা বোধহয় আর কেউ নেই পৃথিবীতে। আর মেয়েটা যদি হয় গৃহিণী। ডলির বর্তমান বয়স ৩২ বছর। বিয়ে হয়েছিলো আরো এক যুগ আগে। বিবাহিত জীবনের শুরু হতেই তার সাথে আমার পরিচয়ের সূত্রপাত। আমি তাকে কখনো হাসতে দেখিনি। এবার বলছি ডলির আদ্যোপান্ত।

বছর দশেক আগে একদিন সে আমার চেম্বারে এসেছিলো Threatened Abortion নিয়ে। dx হলো Blighted ovum হিসেবে। Evacuation এর পর ছয় মাসের মধ্যে বাচ্চা নিতে নিষেধ করেছিলাম। এরপর আমারই পরামর্শে সে আবারো বাচ্চা নিলো। আবার সেই Blighted ovum. তার তৃতীয় গর্ভধারণেও এলো blighted ovum. এরই মধ্যে ২ বছর পার হয়ে গেল। হতাশা ওকে নিমজ্জিত করলেও আমি আশাহত হলাম না। বললাম, “তোমার বাচ্চা হবে,ধৈর্য ধরো”- সান্ত্বনা দিলাম ওকে।

তার ৪র্থ ও ৫ম ইস্যু ছিলো এমন দুবারই ভ্রূণ গর্ভে মারা গিয়েছিলো (Missed abortion)। অর্থাৎ এ পর্যন্ত 3 blighted ovums+2 missed abortions.

দেখতে দেখতে পাঁচ বছর কেটে গেল। ওর কষ্ট, হতাশা দেখে মনে হচ্ছিলো ওর চেয়ে অসুখী আর কেউ নেই ধরাধামে। আমি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম মা হওয়াটাই জীবনের সবটুকু নয়, এর বাইরেও অনেক বড় এক জগৎ আছে। আর বাচ্চা নেয়ার চেষ্টা না করে দত্তক নিতে বললাম ওকে। আমিও যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম দত্তকের ব্যবস্থা করে ওর শূন্য বুকের হাহাকার দূর করতে। কিন্তু ব্যর্থ হলাম।

এভাবে আরো দুই বছর পেরিয়ে গেলো। আমিও তাকে ভুলে যেতে শুরু করলাম। হঠাৎ একদিন সে আবার চেম্বারে এসে হাজির, ৫ মাসের গর্ভ নিয়ে। রাগ করেই বললাম,”আবারো বাচ্চা নিলে, আমার সাথে দেখাও করলে না”? বললো, এবার সে পানি পরা খাচ্ছে, ঝাড়-ফুক নিচ্ছে, আমার কাছে দোয়া চাইতে এসেছে। আমি ভাবলাম-“বিশ্বাসে মিলায় বস্তু”। ওর মা হওয়াটাই জরুরি। ওকে পরীক্ষা করতে বললাম, রাজি হলো না। চলে গেলো। মনে মনে ভাবলাম “তোমাকে আবারো আসতেই হবে”। যাই হোক ১ মাস পরে সে আবারো আমার চেম্বারে এলো ব্যথা ছাড়া প্রচুর রক্তক্ষরণ নিয়ে। ক্লিনিকে ভর্তি হলো সে। ৩-৪ ব্যাগ রক্ত দিলাম, dx:central placenta previa। সুস্থ হয়ে সে আবার বাড়ি ফিরে গেলো। আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলো, হঠাৎ তার আবার তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হলো, আবারো সে ক্লিনিকে ভর্তি হলো। সে তখন hypovolumic shock এ। তড়িঘড়ি করে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হলো। Treatment এর বিষয়ে সব instructions দিয়ে দিলাম। শঙ্কা  হচ্ছিলো ও বাঁচবেতো! সে যাত্রা সে বেঁচে গেল। আমার সাথে কিছুদিন আর যোগাযোগ রাখলো না। আমিও ভয়ে ওর আর খবর নিলাম না। ভাবলাম এবার বোধহয় ও আমাকে মুক্তি দিয়েছে।

কিন্তু বিধি বাম! মাস খানেক পর ও আবারো আমার চেম্বারে হাজির হলো। আমি ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। যাই হোক, মাঝে মাঝে তার রক্ত ক্ষরণ হচ্ছিলো। এই করে করেই ৩৭ সপ্তাহ পার করলাম। আগেই সব জানা ছিলো (central placenta previa)। কাজেই ৫/৬ জন ডোনার সহ ওকে C/S এর জন্য ভর্তি করলাম। একটা ছেলে বাচ্চা হলো-“Asphyxiated neonatarum”.Dx হলো-“CHD e’ tracheo-oesophagial fistula”.Better Mx এর জন্য বাবুটাকে ঢাকায় refer করা হলো।

সপ্তাহ যেতে না যেতেই ডলির একটা ফোন এলো। অনেক ভয়ে ভয়ে আমি ওর ফোনটা ধরলাম। ও কিছুই বলতে পারছিলো না, পাগলের মতো হাউ-মাউ করে কাঁদছিল। আপনারা বিশ্বাস করুন অমন হৃদয়স্পর্শী কান্না আমি এ জীবনে আর শুনিনি। বাচ্চাটা মারা গেছে। বিষণ্ণতা আমাকেও গ্রাস করলো।

এরপর সে অনেকটাই অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলো। মাঝে মাঝেই আমার চেম্বারে আসতো। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। কি জানি কি ভাবতো, শুধু বুঝি আমিই হয়তো ওর কষ্ট বুঝি? তাকে আমি কখনোই হাসতে দেখিনি।

এরপর দু-দুটো বসন্ত পেরিয়ে গেলো। কিন্তু আমার ডলির জীবনে চৈত্রের হাহাকার। আবারও সে আমার কাছে এলো, আমার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার সপ্তম গর্ভ নিয়ে। আমি সত্যি সত্যি আশাহত হলাম। ওকে বুঝতে দিলাম না।

এরপর শুরু হলো আবার নূতন যুদ্ধ। মাঝে মাঝে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে, এ আর নতুন কি! আমরাও এগিয়ে যেতে থাকলাম। ৫ মাসের দিকে দু-দুবার Anomaly scan করালাম। বাচ্চার কোন বিকলঙ্গতা ধরা পরলো না, কিন্তু এবারও placenta নিচে তৈরি হচ্ছে। এটাও পরে dx হয়েছিলো placenta previa হিসেবে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম placenta previa accreata কিনা? তাহলেতো যে কোন সময় “Hysterectomy is the must”আর সেটা নিশ্চয়ই না চাইলেও আমারই হাতে হবে।

তার একটা ভিডিওটা pregnancy নিয়ে। এবারো সে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ নিয়ে ৩৭ সপ্তাহে ভর্তি হলো। আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। অনেকজন ডোনার চলে এলো। C/S করতে গিয়ে দেখলাম placenta previa Type-lll anterior. মুহূর্তের মধ্যেই সরাসরি placenta কেটে ভিতরে গেলাম। হাত ঢুকিয়ে দেখি lower uterine segment সম্পূর্ণ empty. fetus upper uterine segment এ, Transverse lie. হঠাৎ একটা হাত বেরিয়ে গেল। তাৎক্ষণিকভাবে হাতটা ভেতরে ভরে মাথা feel করলাম। এর গাইডেন্সে back feel করে buttock এ পৌছালাম। এরপর internal podalic version করে fetus এর পা ধরে ওকে দ্রুত বাইরে টেনে নিয়ে আসলাম। ইতোমধ্যে অনেকটা রক্তক্ষরণ হলো। বাচ্চাও depressed বের হলো। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই prompt active management এ তার vigor ভালো হলো।

দশ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় ডলিকে এই প্রথম আমি হাসতে দেখলাম। এ হাসি হৃদয়ে ঢেউ তোলে, মন কেমন জানি করে, যা বলা যায় না, যায় না কাউকে বোঝানো।

আমরা যারা কসাই ডাক্তার, লোভী ডাক্তার, ডলিদের মতো হাজারো ডলির সাথে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের লোভ কিভাবে সামলাবো আর ডলিদের মতো দুঃখী মায়ের পেটে ছুরি চালিয়ে কসাই হবার লোভই বা কি করে এড়িয়ে যাব!

আমি আজ ভাবি যদি বেঁচে থাকে ডলির এই ছেলে কি বুঝবে মায়ের মর্যাদা, বুঝবে কি আমাদের সন্তানেরা আমাদের কতো ত্যাগ স্বীকার করতে হয় শুধু মা হয়েছি বলে?

লিখক ঃ

ডা. সাঈদা সুলতানা (সুইটি)

২০ তম ব্যাচ, শে.বা.চি.ম, বরিশাল

ROOT

করোনার ৩ নতুন উপসর্গ হচ্ছে সর্দি, বমিভাব আর ডায়রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা (সিডিসি) করোনাভা্রাসের নতুন তিনটি উপসর্গ চিহিৃত করেছে। নতুন ৩ উপসর্গ হচ্ছে সর্দি, বমিভাব আর ...
Read More

করোনায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামানের মৃত্যু

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামান মারা গেছেন। ...
Read More

করোনা উপসর্গ নিয়ে যুবকের মৃত্যু

গাজীপুরের শ্রীপুরে করোনা উপসর্গ নিয়ে ফিরোজ আল-মামুন (৪০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ফিরোজ উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের মাওনা গ্রামের মৃত ...
Read More

অতিরিক্ত অর্থে মিলছে অক্সিজেন

রাজশাহীতে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আর এর চাইতেও বেশি আছে করোনা উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা। এ ধরনের ...
Read More

উপসর্গে ওসমানী মেডিকেলের অধ্যাপক ডা. গোপাল শংকরের মৃত্যু

সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. গোপাল শংকর দে করোনাভাইরাসের ...
Read More

চীনের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হতে পারে বাংলাদেশে

করোনাভাইরাস নির্মূলে চীন আবিষ্কৃত সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বাংলাদেশে হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। ...
Read More

ক‌রোনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপদেষ্টার মৃত্যু

করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট উপদেষ্টা আল্লাহ মালিক কাজেমী মারা গেছেন। শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে এভার কেয়ার ...
Read More

রাজশাহীতে করোনা উপসর্গ নিয়ে দু’জনের মৃত্যু,

প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে মারা গেছেন একজন। আরেকজনের মৃত্যু হয়েছে করোনার উপসর্গ নিয়ে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল ...
Read More

করোনায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের মৃত্যু

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বেসরকারি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি ...
Read More
%d bloggers like this: