লকডাউন শিথিল নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে বিশেষজ্ঞদের অভিমতক কঠিন হুঁশিয়ারির

করোনা ভাইরাস থেকে সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে। এ নিয়ে দেশের ভেতরে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এমনকি হোয়াইট হাউজের করোনা টাস্কফোর্সের শীর্ষ দুই বিশেষজ্ঞ কংগ্রেসে এক শুনানিতে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, অন্যান্য দেশের মতো যদি লকডাউন শিথিল করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা আমলে নিচ্ছেন না প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি অনেক মার্কিনিও তোয়াক্কা না করে বাইরে বের হচ্ছেন। আবার অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে কাজে ফিরেছেন ব্রিটিশরা।

কঠিন পরিণতি ভোগের হুঁশিয়ারি

প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে শুনানিতে অংশ নেন করোনা টাস্কফোর্সের দুই শীর্ষ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি এস ফাউচি ও ড. রবার্ট আর রেডফিল্ড। ফাউচি দেশটির সংক্রামক রোগের শীর্ষ বিশেষজ্ঞ ও টাস্কফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। আর রেডফিল্ড মার্কিন সেন্টারস ফর ডিজেস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) পরিচালক। তারা দুজন সিনেটের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শ্রমবিষয়ক কমিটিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনই যদি অর্থনীতি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পরিণতি খুবই ভয়াবহ হবে। কারণ দেশে এখনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এবং সংক্রমিত মানুষকে সঠিকভাবে নির্ণয় করার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

ড. অ্যান্থনি ফাউচি বলেন, ‘আমরা সঠিক পথে না থাকলে কমিউনিটি বা গোষ্ঠীগত সংক্রমণ শুরু হবে। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুব কঠিন হবে। ভিডিও কনফারেন্সে ড. ফাউচি আরো সতর্ক করেন, এখনই অর্থনীতি খুলে দেওয়ার অর্থ হলো সংক্রমণকে আরো দ্রুতগতিতে বাড়িয়ে দেওয়া, যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এতে কেবল যে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যায় গতি আনবে তা নয়, শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি আরো সংকটে আবর্তিত হবে। ফাউচি ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়ে হালনাগাদ তথ্য সিনেটকে জানান।

ড. ফাউচির সঙ্গে একমত পোষণ করে ড. রেডফিল্ড ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, ‘আমরা এখনো ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা থেকে বের হতে পারিনি।’ তিনি তার বিভাগের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বৃদ্ধাশ্রমের দিকে নজর দিতে সিনেটরদের প্রতি আহ্বান জানান। এদিকে অস্কার বিজয়ী অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো বলেছেন, করোনায় মানুষের মৃত্যু নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো চিন্তা নেই।

তার পরও ঘরের বাইরে মার্কিনরা

শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারিকে মানছেন না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, বছর বছর ধরে তো অর্থনীতি বন্ধ রাখা যায় না। তার মতে, সরকারের সঠিক পদক্ষেপে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তিনি বিভিন্ন রাজ্যে অর্থনীতি খুলে দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস সেল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, কোটি কোটি মার্কিনি ঘরের বাইরে। বিভিন্ন রাজ্য সরকারও ইতিমধ্যে অর্থনীতি খুলে দিতে শুরু করেছে। পত্রিকাটি জানায়, গত সপ্তাহে গড়ে আড়াই কোটি মানুষ প্রতিদিন ঘরের বাইরে গিয়েছিলেন। গত ২০ মার্চ বিভিন্ন রাজ্যে ‘স্টে হোম’ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ বা ১৪৪ মিলিয়ন মার্কিনি (১৪ কোটি ৪০ লাখ) ঘরে ছিল। যদিও এর মধ্যে অনেক রাজ্যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। কিন্তু গত সপ্তাহে বাড়িতে থাকার হার ৩৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুসারে, দেশটিতে করোনায় মারা গেছে ৮৩ হাজার ৫৬৪ জন এবং আক্রান্ত ১৪ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯ জন। বিশ্বে সংক্রমিত হয়েছে ৪৩ লাখ ৭৬ হাজারের অধিক এবং প্রাণ গেছে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯৪ জনের।

ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি

ব্রিটেনে গত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে অর্থনীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। অর্থনীতির এই ধাক্কা সামলাতে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন। এর ফলে গতকাল থেকেই কাজে ফিরতে শুরু করেছেন ব্রিটিশরা। যদিও প্রধানমন্ত্রী বরিস ভাইরাসের বিস্তার রোধে বেশি বাড়ির বাইরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে।

সৌদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, সেখানে ঈদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কারফিউ জারি থাকবে। সোশ্যাল মিডিয়া টুইটারের প্রধান অফিস সানফ্রান্সিসকো বলেছে, কোম্পানিটির ৫ হাজার কর্মী মার্চ থেকে বাড়িতে বসে কাজ করছেন। বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা এত দারুণভাবে কাজে দিয়েছে যে টুইটার এখন খুব প্রয়োজন না হলে কাউকেই অফিসে আসতে বলবে না।

ROOT

%d bloggers like this: