সুন্দরবনে নৌ অ্যাম্বুল্যান্স — ভালো থাকুন

সুন্দরবনে নৌ অ্যাম্বুল্যান্স

খোলপেটুয়া নদীর বুকচিরে সুন্দরবনের নিস্তব্ধতা ভেঙে কলাগাছি ক্যাম্পের দিকে ছুটে চলেছে একটি নৌযান। খবর এসেছে সেখানে বাঘের আক্রমণের শিকার হয়েছেন মৌয়াল আছির উদ্দিন (৪৭)। তাঁকে উদ্ধারের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। উদ্ধার না হয় করা গেল। কিন্তু তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা? হ্যাঁ, এই নৌযানেই রয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা। কারণ এটি কেবলই নৌযান নয়, পরিপূর্ণ সুবিধাসংবলিত একটি অ্যাম্বুল্যান্স। আর গত বছরের ১৩ জুনের ওই ঘটনায় এ অ্যাম্বুল্যান্সের সুবাদেই শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান আছির উদ্দিন।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রত্যন্ত সুন্দরবনের নদীতেই পাওয়া যায় অ্যাম্বুল্যান্স। নিরাপত্তা প্রহরীর মতো সুন্দরবনের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নদী ও খালে এটি টহল দিয়ে বেড়ায়। এটি একটি ছোট আকারের লঞ্চ। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে অক্সিজেনসহ সব ধরনের ব্যবস্থা। স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘লিডার্সে’র (লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ সোসাইটি) উদ্যোগে কয়েক বছর ধরে সুন্দরবনের বনজীবী মানুষকে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই অ্যাম্বুল্যান্স। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় অংশের সুন্দরবনের ইতিহাসে এমন উদ্যোগ এই প্রথম।

ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল সংশ্লিষ্ট জনপদের কয়েক লাখ মানুষ। সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরে, বনের কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহ কিংবা মধু সংগ্রহ করে চলে তাদের জীবন-জীবিকা। বনে বাঘ আর জলে কুমিরের ভয় উপেক্ষা করেই এসব বনজীবী এভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের বিভিন্ন সময়ে ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এসব হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের শিকার হতে হয়।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাঘ, হাঙর (স্থানীয়ভাবে কামট বলে) ও কুমিরে আক্রান্তদের মধ্যে যাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তাদের বেশির ভাগই দ্রুত চিকিৎসাসেবার অভাবে প্রাণ হারায়। এসব দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বের কথা ভেবেই তাদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে নৌ অ্যাম্বুল্যান্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১১ সালে ছোট একটি লঞ্চে অ্যাম্বুল্যান্সের সব সুযোগ-সুবিধা স্থাপনের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই এই সেবা এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলে। তারই ধারাবাহিকতায় পরে বৃহত্তর পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে লিডার্স।

সুদূর অতীত থেকেই সুন্দরবনের বাওয়ালি ও মৌয়ালরা পেশাগত কারণে বনে প্রবেশের আগে গাজী-কালুর নামে শিরনি কিংবা বনবিবির পূজা করে থাকে। বর্তমান সময়ে এসে তারা শিরনি ও পূজার পাশাপাশি এই নৌ অ্যাম্বল্যান্সের নামও স্মরণ করে। স্থানীয় বাওয়ালি মোকছেদ আলী এমন তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘বনে যাওয়ার সময় আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মধ্যে বর্তমানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নৌ অ্যাম্বুল্যান্সের মোবাইল নম্বর সঙ্গে রাখা। উদ্দেশ্য, বিপদ-আপদে গভীর জঙ্গলের মধ্যে থেকেও যেন যোগাযোগ করতে পারি। ’

কথা হলো লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডলের সঙ্গে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করে। তাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাব। কয়েক বছর আগেও বনজীবীরা কোনো ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হলে লোকালয়ে এসে গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে সেবা নিতে হতো। কিন্তু গভীর জঙ্গল থেকে সাধারণ নৌকায় আক্রান্ত রোগীকে লোকালয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগে। তাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অনেকের মৃত্যু হতো। তাদের এমন দুর্দশা লাঘবের উদ্দেশ্য নিয়েই সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে নৌ অ্যাম্বুল্যান্স সেবা চালু করা হয়েছে। ’

‘জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ জনগণের জীবন-জীবিকা নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় চলছে এই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। এ বিষয়ে প্রকল্প কর্মকর্তা শওকত হোসেন জানান, প্রথমে নিজস্ব উদ্যোগে চালু হলেও ২০১৩ সালে জার্মান দাতা সংস্থা ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ডের সহযোগিতায় নৌ অ্যাম্বুল্যান্স সেবা কার্যক্রমে সংস্কার আনা হয়। নিয়োগ দেওয়া হয় একজন চিকিৎসক। বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার ১৪টি দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে অ্যাম্বুল্যান্সের হেল্পলাইন নম্বর। সে সুবাদে যেকোনো সময় আক্রান্ত মানুষ এই সেবা গ্রহণ করতে পারে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি এলাকায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।

নৌ অ্যাম্বুল্যান্সের প্রধান চিকিৎসক সুব্রত রায় জানান, সুন্দরবনে বিশেষত বাঘ ও কুমিরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারে সব সময় প্রস্তুত থাকে নৌ অ্যাম্বুল্যান্স। এই অ্যাম্বুল্যান্সে রোগী পরিবহনের বেড, অক্সিজেনসহ সব ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অ্যাম্বুল্যান্সটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি আরো জানান, সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী ১৪টি স্পটে মাসে একবার স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প বসে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে স্বাস্থ্য ক্যাম্পের দিন ও সময় জানিয়ে প্রচার করে। নিয়মিত সেবা নিতে আগ্রহী দুস্থ অসহায় পরিবারগুলোকে প্রাথমিক জরিপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা কার্ড দেওয়া হয়। একটি কার্ডের মালিক ও তাঁর পরিবার যতবার প্রয়োজন চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ নিতে পারেন। কার্ডধারী ছাড়াও যে কেউ ইচ্ছা করলে ক্যাম্পে এসে চিকিৎসাসেবা নিতে পারে।

শ্যামনগর উপজেলার ভামিয়া গ্রামের ষাটোর্ধ্ব স্বপ্না মণ্ডল বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। অসুখ-বিসুখ হলে উপজেলার হাসপাতালে কখনো ডাক্তার দেখাতে যেতে পারিনি। এখন এই মেডিক্যাল ক্যাম্পেই ডাক্তার দেখাই। ওরা ওষুধও দিয়ে দেয়। ’

একই গ্রামের মিনতি রানী বলেন, ‘এই ক্যাম্পে পুরুষের থেকে গ্রামের নারীরা বেশি আসে। কারণ সুন্দরবনে বাঘ-কুমিরসহ নানাভাবে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুতে এই জনপদে নারীপ্রধান পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। ’

লিডার্সের তথ্যানুযায়ী, কার্ডধারীদের বাইরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই ক্যাম্পে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছে তিন হাজার ২০০ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ৮৩৮ জন, মহিলা দুই হাজার ৬০ জন ও শিশু ৩৯৪ জন। বর্তমানে এই প্রকল্পের আওতায় তিন হাজার ৫০০টি স্বাস্থ্য কার্ডধারী পরিবার রয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জি এম আলী আজম টিটো বলেন, ‘গাবুরা ইউনিয়নটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার আঘাতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্গত এই চরাঞ্চল থেকে নদী পেরিয়ে উপজেলা সদরে স্বাস্থ্যসেবা নিতে যাওয়া শুধু দুরূহই নয়, কখনো কখনো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নৌ অ্যাম্বুল্যান্স স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের ফলে এখানকার অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছে। ’

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোজাফফর হোসেন শিকারি বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে এলাকার মানুষ খুব খুশি। এতে অনেকের রোগমুক্তি মিলেছে। ’ শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর গ্রামের খোদাবক্স গাজী বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন থেকে চর্মরোগে ভুগছিলাম। নৌ অ্যাম্বুল্যান্সের ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে এখন সুস্থ আছি। ’

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জানান, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও সব জায়গায় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এই মুহূর্তে অসম্ভব। তা ছাড়া দ্বীপ বা উপকূলীয় অঞ্চলে ডাক্তারদের কাজে আগ্রহ কম। শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও ঘূর্ণিঝড় আইলায় একটি ক্লিনিক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যটিতেও কোনো ডাক্তার বসেন না। পদ্মপুকুরে এখনো কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। এ ছাড়া দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া খুবই কঠিন। সুন্দরবনের অভ্যন্তরের পাশাপাশি ওই সব এলাকায়ও নৌ অ্যাম্বুল্যান্স স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের কার্যক্রম বাড়াতে পারলে এসব অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসাসেবার আওতায় চলে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ROOT

করোনার ৩ নতুন উপসর্গ হচ্ছে সর্দি, বমিভাব আর ডায়রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা (সিডিসি) করোনাভা্রাসের নতুন তিনটি উপসর্গ চিহিৃত করেছে। নতুন ৩ উপসর্গ হচ্ছে সর্দি, বমিভাব আর ...
Read More

করোনায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামানের মৃত্যু

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামান মারা গেছেন। ...
Read More

করোনা উপসর্গ নিয়ে যুবকের মৃত্যু

গাজীপুরের শ্রীপুরে করোনা উপসর্গ নিয়ে ফিরোজ আল-মামুন (৪০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ফিরোজ উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের মাওনা গ্রামের মৃত ...
Read More

অতিরিক্ত অর্থে মিলছে অক্সিজেন

রাজশাহীতে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আর এর চাইতেও বেশি আছে করোনা উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা। এ ধরনের ...
Read More

উপসর্গে ওসমানী মেডিকেলের অধ্যাপক ডা. গোপাল শংকরের মৃত্যু

সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. গোপাল শংকর দে করোনাভাইরাসের ...
Read More

চীনের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হতে পারে বাংলাদেশে

করোনাভাইরাস নির্মূলে চীন আবিষ্কৃত সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বাংলাদেশে হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। ...
Read More

ক‌রোনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপদেষ্টার মৃত্যু

করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট উপদেষ্টা আল্লাহ মালিক কাজেমী মারা গেছেন। শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে এভার কেয়ার ...
Read More

রাজশাহীতে করোনা উপসর্গ নিয়ে দু’জনের মৃত্যু,

প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে মারা গেছেন একজন। আরেকজনের মৃত্যু হয়েছে করোনার উপসর্গ নিয়ে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল ...
Read More

করোনায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের মৃত্যু

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বেসরকারি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি ...
Read More
%d bloggers like this: